
আব্দুল মুনিব কানাডা থেকে : সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের শ্রিভপোর্ট সিটিতে এক কৃষ্ণাঙ্গ তার ১ থেকে ১৪ বছর বয়সি ৭টি সন্তান এবং অপর এক শিশুকে গুলি করে হত্যা করার পর সে দেশে পারিবারিক হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি আবারও আলোচিত হচ্ছে। গত ১৫ বছরের যুক্তরাষ্ট্রে ২২৭টি বড় ধরনের পারিবারিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রতি পাঁচ দিনে পারিবারিক সহিংসতায় অন্তত একজনের মৃত্যু হয়েছে, যা পরিবারে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের একটি পর্যায় মাত্র। কোনো কোনো ঘটনায় ঘাতকের নিজের আত্মহত্যা অথবা পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। এসব ঘটনার মধ্যে অন্তত তিনটি ঘটেছে অভিবাসী বাংলাদেশি পরিবারে। ২০২১ সালের এপ্রিলে টেক্সাসের ডালাস সিটির অদূরে অ্যালেনে এক বাংলাদেশি পরিবারে সংঘটিত এমন এক ঘটনায় দুই ভাই প্রথমে গুলি করে মা-বাবাসহ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করে নিজেরাও গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়াকে মনস্তত্ত্ববিদরা বলছেন ‘পারিবারিক সহিংসতার মহামারি’। পুলিশ এসব ঘটনাকে ‘পেশাদারি কায়দায় ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড’ হিসাবে বর্ণনা করেছে। সমাজ গবেষক, মনস্তত্ত্ববিদ এবং নিওরো-সাইকোলজিস্টদের মতে, পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা বেড়ে চলেছে এবং এ প্রবণতা কমানোর সহজ কোনো উপায় নেই। একটি পরিবারে কে হন্তারক, তা পরিবারের অন্য সদস্যদের পক্ষে সবসময় টের পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। কোনো পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সংঘাতের অনিবার্য পরিণতি কী হতে পারে, তা আঁচ করা সম্ভব হলেও বড় পরিবারে আঁচ করা সম্ভব হয় না-তাদের মধ্যে কে কখন পরিবারকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে। লুইজিয়ানায় ঘটে যাওয়া ওই দুঃখজনক ঘটনার একদিন আগেও ঘাতক পিতা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সৈনিক ৩১ বছর বয়স্ক শামার এলকিনসের কোনো কথা বা আচরণ থেকেও বোঝা যায়নি লোকটি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে নিজ বাড়িতে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে একে একে তার ৪ কন্যা ও ৩ পুত্রসন্তানকে হত্যা করতে পারে। পিতা হিসাবে সন্তানদের সঙ্গে তার গাঢ় আবেগময় সম্পর্ক ছিল বলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার গুলিবিদ্ধ স্ত্রী ও প্রতিবেশীরা পুলিশকে জানিয়েছে। কিন্তু তার মাঝে হতাশা ও অবসাদ ছিল এবং তিনি খ্যাপাটে স্বভাবের ছিলেন। ১৯৮৯ সালের এপ্রিলে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার সনোমা কাউন্টিতে র্যামন সালসিডো নামে ২৮ বছর বয়স্ক মেক্সিকান অভিবাসী ধারাল অস্ত্রের আঘাতে তার স্ত্রী, দুই শিশুকন্যা, শাশুড়ি ও দুই শ্যালিকাসহ পরিবারের মোট ৬ সদস্য এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত সন্দেহে কর্মস্থলে এক পুরুষ সহকর্মীকে হত্যা করে। গলায় গুরুতর আঘাতে জ্ঞান হারিয়ে তার তিন বছর বয়সি এক কন্যা বাড়ির পাশের আবর্জনার স্তূপে পড়ে ছিল। ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পর তাকে উদ্ধার করা হয়। সাতটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে র্যামন সালসিডো মেক্সিকো পালিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাকে মেক্সিকো থেকে ফিরিয়ে আনে এবং বিচারে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যা কার্যকর হয়েছে ১৯৯০ সালে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীরা ক্রমবর্ধিষ্ণু জনগোষ্ঠী। তাদের বেশির ভাগ পরিশ্রমী এবং তারা তাদের নিজেদের আমেরিকান স্বপ্ন পূরণের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি আমেরিকানদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার জন্যও ভূমিকা রেখে চলেছেন। কিন্তু সবকিছুই যে শতভাগ ভালোভাবে চলে এমন নয়। সর্বত্র কোনো না কোনো ধরনের ব্যতিক্রম ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী বাংলাদেশি পরিবারেও এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। সাদা ভেড়ার পালে একটি কালো ভেড়া থাকেই। বাংলাদেশেও আছে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারেও আছে। তাদের ‘পরিবারের কলঙ্ক’ বলাই ভালো। সিলিকন ভ্যালি খ্যাত উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান হোজে সিটিতে তিন দশক ধরে বসবাস করছিলেন প্রকৌশলী গোলাম রাব্বী ও তার স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রী শামীমা। তাদের দুই ছেলের মধ্যে বড়টি হাসিব (২৩) আপাদমস্তক আমেরিকান সংস্কৃতি ধারণ করে সমকামীতে পরিণত হয়েছিল, যা আমেরিকান সমাজে দোষনীয় কিছু নয়। হাসিব তার এক শ্বেতাঙ্গ সমকামী সঙ্গীকে বাড়িতে এনে রাখবে। একটি ধর্মপরায়ণ, নামাজি দম্পতির পক্ষে কীভাবে তা মেনে নেওয়া সম্ভব? এ নিয়ে কলহ-বিবাদ চলছিল অনেকদিন থেকেই। একপর্যায়ে হাসিব গুলি করে হত্যা করে মা-বাবাকে। ছোট ভাই ওমরের (১৭) সামনেই ঘটেছে হত্যাকাণ্ড। সে ভাইকে বাধা দেয়নি। দুই ভাই তৃতীয় একজনের সঙ্গে পালানোর পথে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৩০ মাইল দূরে তাদের আটক করে। বিচারে হাসিবকে আমৃত্যু কারাবাসের দণ্ড দেওয়া হয়েছে। শুরুতে ২০২১ সালে টেক্সাসে দুই বাংলাদেশি অভিবাসী ভাইয়ের হাতে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা এবং খুনি দুই ভাইয়ের আত্মহত্যার ঘটনা উল্লেখ করেছি। বাংলাদেশে তাদের বাড়ি ছিল পাবনায়। দুই ভাই তানভীর (২১) ও ফারহান (১৯) হত্যা করে তাদের দাদি (৭৭), বাবা (৫৪), মা (৫৬) ও বোনকে। এরপর তারা আত্মহত্যা করে। ঘটনাস্থলে একটি সুইসাইড নোট পেয়েছে পুলিশ। ফারহানের লেখা নোটে ছিল, ‘পরিকল্পনাটি খুব সহজ ছিল। আমরা দুটি আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করি। একটি দিয়ে আমি আমার বোন ও দাদিকে গুলি করি, আরেকটি দিয়ে আমার ভাই আমাদের মা-বাবাকে হত্যা করে। এরপর আমরা নিজেদের সরিয়ে নেব। আমি যদি শুধু নিজেকে হত্যা করতাম, তাহলে তাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক হতো। আমি আমার পরিবারকে ভালোবাসি। যথার্থই ভালোবাসি। এবং সে কারণেই আমি তাদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ গবেষকরা দেখেছেন, পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই পুরুষ, যাদের সহিংসতার ঘটনা ইতঃপূর্বেও ঘটেছে তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে। নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির নিওরো-সাইকোলজির প্রফেসর রবার্ট হ্যানলন বলেছেন, ‘পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে ধনী দেশগুলোতে, যেখানে খুব সহজে আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে এ সুবিধা প্রায় উন্মুক্ত। আগ্নেয়াস্ত্র হাতে পেলে যে কোনো পর্যায়ের মানসিক ভারসাম্যহীন অথবা অবসাদ ও হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিরা নিজেদের হত্যা করার হুমকি দেয় অথবা অন্যের জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক যদি মাদকসেবী হয়, তাহলে দুইয়ের সমন্বয় তাকে আপনজনের ঘাতক হয়ে ওঠার প্রবল আশঙ্কা সৃষ্টি করে।’ গত বছরের সেপ্টেম্বরে পারিবারিক কলহের জের ধরে অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ছোট এক সিটি লেভিনে বসবাসকারী বাংলাদেশি অভিবাসী আবুল আহসান হাবিব (৫২) তার স্ত্রী সোহেলি আখতারকে (৪৩) গুলি করে হত্যা করে তাদের ২৯ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটান। এর আগে কলহের একপর্যায়ে সোহেলি ৯১১-এ ফোন করে তার জীবন বাঁচানোর সহায়তা কামনা করেছিলেন। এ সময় হাবিব তার স্ত্রীকে হত্যা করেন। এরপর হাবিব নিজেকে গুলি করে মৃত্যুর পথ বেছে নেন। তারা দুই তরুণ পুত্রসন্তান রেখে গেছেন। ঘটনার কিছু আগেও বড় ছেলে হাসিব (২৪) বাড়িতেই ছিলেন। পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পেছনে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রভাব রয়েছে। আমেরিকান বহুজাতিক সমাজে চলমান আগ্নেয়াস্ত্র সহিংসতায় প্রাণহানি এসব সমস্যার চেয়েও অধিকতর গভীর ও জটিল। সমাজের অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা বন্দুক সহিংসতায় প্রতিনিয়ত প্রাণহানি ঘটছে মানুষের। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানী ও মানসিক ব্যাধির চিকিৎসকরাও উদ্বিগ্ন অপ্রতিরোধ্য এ আগ্নেয়াস্ত্র সহিংসতায়। প্রায় ৩৪ কোটি জনসংখ্যার দেশ আমেরিকায় গড়ে প্রতিদিন ১৩০ জনের প্রাণহানি ঘটে আগ্নেয়াস্ত্র সহিংসতায় এবং আহত হয় প্রায় ২০০ জন; সে হিসাবে প্রতিবছর প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭ হাজারে। আগ্নেয়াস্ত্র সহিংসতা আমেরিকান সমাজে বড় ধরনের একটি মানবিক সমস্যা। প্রতিরোধযোগ্য এ জনস্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানের দাবি বারবার উচ্চারিত হলেও কার্যত এর কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। যখনই কোথাও কোনো আগ্নেয়াস্ত্র সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, তখনই দেশটির জনগণ সোচ্চার হয়। কদিন পর সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল হালিম সাগর সম্পাদকীয় কার্যালয় : ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা) টিকাটুলি ঢাকা ১২০৩। ফোন : 01722-062274, 01715-496849, ই- মেইল halimshagor2000@gmail.com Banglasangbad1@gmail.com dainikbanglasangbadbd@gmail.com সিলেট অফিস :-৪০৬ রংমহল টাওয়ার,(৪র্থ তলা) বন্দর বাজার সিলেট ৩১০০। ফোন : 01972-062274। Canada office : 35 bexhilAve Scarborogh. Toranto. canada.
Design & Development By HosterCube Ltd.