
বিশেষ প্রতিনিধি: সিলেট মহানগরীকে একটি নিরাপদ, আধুনিক এবং অপরাধমুক্ত তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে গত আট মাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। বর্তমান পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম-এর দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং প্রযুক্তি-নির্ভর ‘স্মার্ট পুলিশিং’ মডেলের সফল বাস্তবায়নে নগরীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভাবনীয় উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাঁর এই অসামান্য কর্মতৎপরতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০২৬ সালের রাষ্ট্রীয় ‘বিপিএম-সেবা’ পদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনীর হাল ধরে ধাপে ধাপে সেটিকে একটি আধুনিক ও জনবান্ধব বাহিনীতে রূপান্তর করেছেন এই কমিশনার। সম্প্রতি তাঁর বিভিন্ন কার্যক্রম এবং আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে মুখোমুখি হয়েছে জাতীয় একটি দৈনিকের। কমিশনারের সাথে হওয়া সেই দীর্ঘ আলাপচারিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
আইন-শৃঙ্খলা ও অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স: “আমি সিলেটে যোগদানের পর সাধারণ মানুষ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকদের মতামত নিয়ে অপরাধ দমনের রূপরেখা তৈরি করেছি। অপরাধীর কোনো বিশেষ পরিচয় নেই, তার পরিচয় কেবল ‘অপরাধী’। গত এপ্রিল ২০২৬-এর মাত্র ১৫ দিনেই আমরা বিশেষ অভিযানে ৮৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছি, যার মধ্যে ৫৪ জনই চিহ্নিত ছিনতাইকারী। ছিনতাই রোধে প্রতিটি থানায় ছিনতাইকারীদের ছবি টানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত মার্চ ও এপ্রিলে পৃথক দুটি ৩২ ঘণ্টার সাড়াশি অভিযানে ১৬১ জন মাদক কারবারি ও চোরাচালানকারীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।”
সাইবার নিরাপত্তা ও বিজ্ঞপ্তির সমাধান: “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার এবং অপতথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি রোধ করা বর্তমান সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সিলেট মহানগরীকে এই ডিজিটাল ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখতে আমরা এসএমপি’র সাইবার টিমকে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল দিয়ে পুনর্গঠিত করেছি। আমার প্রত্যক্ষ তদারকিতে ইতিমধ্যেই অসংখ্য ফেক আইডি শনাক্ত এবং মানহানিকর কন্টেন্ট অপসারণ করা হয়েছে। বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তি ও প্রকৃত উদ্দেশ্য, সম্প্রতি আমাদের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তি নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। আমি স্পষ্ট করতে চাই, আমাদের লক্ষ্য কখনোই স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধা দেওয়া নয়। মূলত প্রতি মাসে আমাদের থানাগুলোতে শত শত অভিযোগ জমা পড়ছে যেখানে ভুয়া ফেসবুক আইডি, বেনামী পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। এমনকি আদালত থেকেও অনেক মামলার তদন্ত আমাদের কাছে আসছে। এই অপপ্রচারের ফলে সিলেটের প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকরাও অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। সেই প্রেক্ষিতেই আমরা একটি বিশেষ টিম গঠন করি। তবে বিজ্ঞপ্তিতে অসাবধানতাবশত কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দের ব্যবহার হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, যা জানার পরপরই আমরা বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহার করে নিয়েছি। আপনারা জানেন, বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ (এবং প্রাসঙ্গিক দণ্ডবিধি) অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমে কারো মানহানি করা বা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা মূলত সেই আইনের বাস্তবায়ন করছি। তদন্ত করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই দেখি, অনেক অনলাইন পোর্টাল বা পেজের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, সম্পাদক বা প্রকাশকের হদিস পাওয়া যায় না। সাইবার নিরাপত্তা আইনের ১৭ ও ২৫ ধারা অনুযায়ী ডিজিটাল জালিয়াতি ও আক্রমণাত্মক তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এসব আইডির মালিক ও ডিভাইস শনাক্ত করা জরুরি। আমরা কেবল সেই আইনি প্রক্রিয়াটিই অনুসরণ করছি। আমি পুনরায় নিশ্চিত করছি, অনলাইন নিউজ পোর্টালের নিবন্ধন বা তদারকির দায়িত্ব পুলিশের নয়; এটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাজ। পুলিশ কেবল তখনই হস্তক্ষেপ করে যখন কোনো নির্দিষ্ট কন্টেন্ট নিয়ে আইনানুগ অভিযোগ বা জিডি করা হয়। আমরা সমাজ গঠনে গঠনমূলক সাংবাদিকতাকে স্বাগত জানাই যা আমাদের তদন্ত কাজেও অনেক সময় সহায়তা করে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ বদ্ধপরিকর। আমরা চাই না কোনো ভুয়া আইডির জন্য প্রকৃত সাংবাদিকদের সম্মানহানি হোক। তাই গুজব ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে আমি সিলেটের সকল গণমাধ্যমকর্মীদের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করছি। আপনারা এগিয়ে আসলে আমরা একটি সুস্থ ও নিরাপদ ডিজিটাল সিলেট গড়ে তুলতে সক্ষম হব।”
যানজট নিরসন ও হকারমুক্ত ফুটপাত: সিলেটের দীর্ঘদিনের সমস্যা ফুটপাত দখল ও যানজট নিয়ে কমিশনার জানান, “যোগদানের পর থেকেই হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করেছি যা এখনো চলমান। জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের সাথে সমন্বিত প্রচেষ্টায় সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক মাসে ১৫৭২টি অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিক্সা, ১৬১৩টি সিএনজি অটোরিক্সা এবং বিপুল সংখ্যক ফিটনেসবিহীন যানবাহনসহ মোট ৬,২৭২টি যান আটক করে ডাম্পিং ইয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে।” প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ: ‘জেনিয়া’ অ্যাপের সফলতা অপরাধ দমনে পুলিশের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কমিশনার চালু করেছেন ‘জেনিয়া’ (এবহরধ) অ্যাপ। তিনি জানান, “এটি এখন সিলেটের নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ৩০,০০০ বারের বেশি ডাউনলোড হওয়া এই অ্যাপের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ২৭৫টি জরুরি ঝঙঝ কল এবং ৪৫টি অপরাধমূলক ইনসিডেন্ট সফলভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এতে তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রেখে অপরাধীদের তথ্য দেওয়ার বিশেষ সুবিধা রয়েছে।”
চোরাচালান ও মাদক নির্মূলে বিশেষ নজর: সীমান্তবর্তী শহর হওয়ায় চোরাচালান রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে কমিশনার বলেন, “শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা প্রায় ৬ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকার ভারতীয় পণ্য আমরা জব্দ করেছি। মাদক নির্মূলে ২০১টি মামলার মাধ্যমে ২৭১ জন আসামিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। চোরাচালানের সাথে যদি এসএমপি পুলিশের কোনো সদস্যের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মোবাইল ছিনতাই ও উদ্ধার অভিযান: সিলেটের প্রধান সমস্যা মোবাইল ছিনতাই রোধে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। কমিশনার জানান, “প্রতি মাসে শতাধিক মোবাইল উদ্ধার করে প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি দক্ষিণ সুরমায় আমার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ৪২২টি চোরাই ও আইএমইআই পরিবর্তিত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে মামলা করা হয়েছে।”
সাইবার ক্রাইম ও বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তি প্রসঙ্গে স্পষ্ট ব্যাখ্যা
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও নির্বাচনী নিরাপত্তা: অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার প্রসঙ্গে কমিশনার মেন্দিবাগস্থ গার্ডেন টাওয়ারে পরিচালিত সফল অভিযানের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ২৬ রাউন্ড কার্তুজসহ দুই দুর্র্ধষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নির্বাচনে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ‘জেনিয়া’ অ্যাপের মাধ্যমে আমরা ‘জিরো ইনসিডেন্ট’ নিশ্চিত করতে পেরেছি, যা একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।”
এসএমপি কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, “যতদিন আমি সিলেটে আছি, আমার নিরবচ্ছিন্ন তদারকির মাধ্যমে সিলেটকে বাংলাদেশের সবচেয়ে নিরাপদ ও শান্তির নগরীতে পরিণত করতে কাজ করে যাবো।”
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল হালিম সাগর সম্পাদকীয় কার্যালয় : ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা) টিকাটুলি ঢাকা ১২০৩। ফোন : 01722-062274, 01715-496849, ই- মেইল halimshagor2000@gmail.com Banglasangbad1@gmail.com dainikbanglasangbadbd@gmail.com সিলেট অফিস :-৪০৬ রংমহল টাওয়ার,(৪র্থ তলা) বন্দর বাজার সিলেট ৩১০০। ফোন : 01972-062274। Canada office : 35 bexhilAve Scarborogh. Toranto. canada.
Design & Development By HosterCube Ltd.