
আব্দুল মুনিব কানাডা থেকে : বিগত আড়াই মাস হলো বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। এ আড়াই মাসে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বলতে গেলে তেমন কিছুই সরকারের তরফ থেকে বলা হয়নি। শুধু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কয়েকদিন আগে জাতীয় সংসদে বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হলো, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও সমৃদ্ধিই হবে পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের ব্যাপারে কারও দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নেই। তবে ব্যাপারটিকে এত সরলীকরণ করার সুযোগ নেই। কারণ, আজকের অর্থাৎ ২০২৬ সালের বাংলাদেশ আর সেই আগের অর্থাৎ সত্তরের দশকের বাংলাদেশ নেই। বিশ্ব রাজনীতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। সেই সঙ্গে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে আঞ্চলিক রাজনীতির। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন এ অঞ্চলের সেন্টার স্টেজে এসেছে। এখন বাংলাদেশের দিকে নজর পড়েছে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের। নজর পড়েছে আঞ্চলিক শক্তি ভারতের। নজর পড়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি চীনের। রাশিয়ারও ইন্টারেস্ট রয়েছে বাংলাদেশে। তবে ’৯০ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন খণ্ডবিখণ্ড হয়ে তার জঠর থেকে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটলে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাশক্তির মর্যাদা হারায়। ওই ১৫টি স্বাধীন দেশের অন্যতম হলো বর্তমান রাশিয়া। রাশিয়া আজ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পেছনে পড়ে গেছে। সামরিক ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে রাশিয়া এখন দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানে থাকলেও অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে চীনের অনেক পেছনে পড়ে আছে। তাই আজ দেখা যায়, বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে এখন প্রধান দুই অ্যাক্টর হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। এ দুই দেশই বাংলাদেশকে তাদের প্রভাব বলয়ে রাখতে চায়। আর ভৌগোলিক সংলগ্নতার কারণে ভারত সবসময় বাংলাদেশের ওপর প্রভুত্ব বজায় আগ্রহী। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এশিয়া তথা ভূমণ্ডলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। কত গুরুত্বপূর্ণ এ অবস্থান, সেটি আমি কিছুক্ষণ পরে আলোচনা করব।
অথচ স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বাংলাদেশ পরাশক্তিদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এ ব্যাপারে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যুগান্তরের পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করছি। ১৯৯৬ সালের একেবারে গোড়ার দিকে মার্কিন দূতাবাস আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাদের তৎকালীন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এক কাপ চা খাওয়ার দাওয়াত করে। তখন আমি দৈনিক ‘ইনকিলাবের’ বিশেষ সংবাদদাতা এবং নিয়মিত কলামিস্ট। যথারীতি সেখানে যাই। আমাকে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে তিনজন সুধীকে দেড় মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। আমি রাজি থাকলে যেন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করি। সেখানেই জানলাম, ওই তিনজনের আরেকজন হলেন সাবেক সচিব মরহুম শাহ আবদুল হান্নান। আমি ওই দাওয়াত কবুল করি এবং ১৯৯৬ সালে দেড় মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফর করি। এটিই ছিল আমার প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। উল্লেখ করা যেতে পারে, আমি কোনোদিন কোনো দূতাবাসে যাইনি এবং এখনো যাই না। কোনো আচার অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেলে সেটি ভিন্নকথা। মার্কিন দূতবাসে প্রাথমিক আলাপে অনেক কথাই হয়। আমি প্রাসঙ্গিকভাবে জিজ্ঞাসা করি, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব কতখানি? তখন রাষ্ট্রদূত তার পেছনে টাঙানো বিশ্বমানচিত্রের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একটি ছড়ি দিয়ে তিনি বাংলাদেশ দেখান এবং বলেন, তোমাদের দেশ কত ছোট এবং কত অনুন্নত। মার্কিন সরকার যেসব দেশকে প্রায়োরিটি দেয়, তার মধ্যে বাংলাদেশ পড়ে না। তারপর ৩০ বছর পার হয়েছে। সেদিন আর নেই। আগেই বলেছি, বাংলাদেশ এবার সেন্টার স্টেজে এসেছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় বাংলাদেশের এত গুরুত্ব। বাংলাদেশ এখন একটি দক্ষিণ এশীয় দেশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ না হয়েও দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হলো বাংলাদেশ। এটিই হলো বাংলাদেশের নবলব্ধ ভূরাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত গুরুত্বের কারণ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যায়। একুশ শতকের শুরু থেকেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পলিটিক্যাল রাডারে রয়েছে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাদের এ ভূমিকায় একটি কার্যকর ইনস্ট্রুমেন্ট ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ। এ তিন শক্তি মিলে সিদ্ধান্ত করে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ জন্য বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জিতিয়ে ক্ষমতায় বসাতে হবে। এবং তাই করা হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখছিল। তাই ওই নির্বাচনের পর ভারত আপার হ্যান্ড পায় এবং হাসিনার সরকারও ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতের চরণ তলে নিজেকে বিসর্জন দেয়। যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশে ভারতের প্রভুত্বকে মেনে নেয়। ২০১২ সালে বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনকে পছন্দ করতেন না; কিন্তু ভারতকে খুশি রাখার জন্য তিনি খামোশ থাকেন। কিন্তু ২০২১ সালে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। এ পয়েন্টে বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে হাসিনা সরকারের বিরোধ শুরু হয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে এতটা গুরুত্ব দেন যে, আওয়ামী লীগ ঠারে ঠুরে বলতে থাকে যে, পিটার হাস বিরোধী দলকে সমর্থন করেন। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রাজনীতি এবং ভূরাজনীতিতে ইউটার্ন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান প্রফেসর ইউনূসকে মার্কিনপন্থি মনে করা হলেও বিপ্লবের স্পিরিট মোতাবেক তিনি বাংলাদেশকে ভারতের আধিপত্যবাদী শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে ড. ইউনূসের অর্থনৈতিক দর্শন মোতাবেক বঙ্গোপসাগর এবং ভারতের সেভেন সিস্টার্স ড. ইউনূসের কাছে উন্নয়নের সিঁড়ি বলে প্রতিভাত হয়। তিনি প্রকাশ্যেই বলেন, বঙ্গোপসাগরের প্রধান পাহারাদার হলো বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগর থেকে সেভেন সিস্টার্স হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত হবে উন্নয়নের মহাসড়ক। এ ফর্মুলা তিনি চীন সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিংয়ের কাছে তুলে ধরেন। ধারণা পাওয়া যায়, চীনের কাছে ড. ইউনূসের এ অর্থনৈতিক দর্শন গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। ওদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারতের প্রভাব দূরীভূত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নাখোশ হয়নি। তবে এবার আর তারা বাংলাদেশকে ভারতের চোখে না দেখে সরাসরি নিজেদের লেন্স দিয়ে দেখতে শুরু করে। এর ফলে অবধারিতভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভেতর স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক এবং সামরিকভাবে খুব বেশি করে চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। চীন এ এলাকায় তথা ভূরাজনীতিতে নিজের প্রভাববলয় বৃদ্ধি করার জন্য ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’, সংক্ষেপে ‘বিআরআই’ প্রমোট করা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রও পালটা ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ নিয়ে অগ্রসর হয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ‘বিআরআই’-এ যোগ দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বারবার চাপ দিলেও বাংলাদেশ মার্কিন মডেলের ইন্দো প্যাসিফিকে যোগ দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশ সম্পর্কে ওয়ান-টু-ওয়ান পলিসি গ্রহণ করেছে। এ পলিসি তারা বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে বাংলাদেশে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের মাধ্যমে। উল্লেখ্য, ক্রিস্টেনসেনের আগে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসে সিনিয়র কূটনীতিক হিসাবে কাজ করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে তার ২০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত হিসাবে তার নিয়োগের কনফার্মেশনের জন্য সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটিতে যে শুনানি হয়, সেখানে তিনি যে সাক্ষ্য দেন, সেখানে কথাগুলো বলেন একেবারে সরাসরি। সাক্ষ্যের এক স্থানে তিনি বলেন, (বাংলা অনুবাদ) ‘এ মাসে (অক্টোবর ২০২৫) বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার চীন থেকে ২০টি জে-১০ জঙ্গিবিমান কেনার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। তারা ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং রাডার ক্রয়েরও চুক্তি অনুমোদন করেছে। এগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে চীনের ওপর বাংলাদেশের সামরিক নির্ভরতা আরও গভীর হবে, যেটি আমরা ঠেকাব কীভাবে?’ বাংলাদেশের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কী চায়, সেটি ওপরের এ সাক্ষ্য থেকে পরিষ্কার। কিন্তু চীনও বসে নেই। ভারত তিস্তা পানিবণ্টন ইস্যুকে দশকের পর দশক ঝুলিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল যাতে শুষ্ক না হয়, তার জন্য তারা তিস্তা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করার আগ্রহ দেখিয়েছে। তিস্তা প্রজেক্ট শুধু একটি বাঁধ নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং সেটিকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলে তিস্তাসংলগ্ন একটি মহানগরীসম জনপদ গড়ে উঠবে। শেখ হাসিনার আমলে এ প্রজেক্টে বাগড়া দিয়েছে ভারত। ড. ইউনূস চীনকে এ প্রজেক্ট দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু তিনি তাদের বলেছেন, এতবড় একটি প্রজেক্ট তিনি তাদের না দিয়ে বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষমাণ রাখছেন। নির্বাচনের আগে চীন সফরের সময় মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে চীনের সহায়তায় তারা তিস্তা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করবেন। নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে দুই-তৃতীয়াংশের মতো বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতায়। ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশে আসার পরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র সরবরাহ করতে চায়। আবার ওইদিকে চীন ও পাকিস্তান থেকে জে-১০ ও জে-১৭ থান্ডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডার কেনার আলোচনাও চলমান। তবে এ সরকারের আমলে সেই আলোচনা চলমান কি না জানা যায়নি। বাংলাদেশে চীনের প্রবল উপস্থিতি ভারতের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল উপস্থিতি ভারতে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, সেটি এখনো জানা যায়নি। বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের আতিশয্যকে যদি বাংলাদেশ মূল্য না দেয়, তাহলে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাপান ইত্যাদি দাতাসংস্থা এবং দাতাদেশের ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যেই ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-এর কিস্তির টাকা প্রদান আটকে গেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খালি হাতে ফিরে এসেছেন। িবিগত আড়াই মাস হলো বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। এ আড়াই মাসে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বলতে গেলে তেমন কিছুই সরকারের তরফ থেকে বলা হয়নি। শুধু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কয়েকদিন আগে জাতীয় সংসদে বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হলো, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও সমৃদ্ধিই হবে পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের ব্যাপারে কারও দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নেই। তবে ব্যাপারটিকে এত সরলীকরণ করার সুযোগ নেই। কারণ, আজকের অর্থাৎ ২০২৬ সালের বাংলাদেশ আর সেই আগের অর্থাৎ সত্তরের দশকের বাংলাদেশ নেই। বিশ্ব রাজনীতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। সেই সঙ্গে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে আঞ্চলিক রাজনীতির। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন এ অঞ্চলের সেন্টার স্টেজে এসেছে। এখন বাংলাদেশের দিকে নজর পড়েছে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের। নজর পড়েছে আঞ্চলিক শক্তি ভারতের। নজর পড়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি চীনের। রাশিয়ারও ইন্টারেস্ট রয়েছে বাংলাদেশে। তবে ’৯০ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন খণ্ডবিখণ্ড হয়ে তার জঠর থেকে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটলে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাশক্তির মর্যাদা হারায়। ওই ১৫টি স্বাধীন দেশের অন্যতম হলো বর্তমান রাশিয়া। রাশিয়া আজ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পেছনে পড়ে গেছে। সামরিক ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে রাশিয়া এখন দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানে থাকলেও অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে চীনের অনেক পেছনে পড়ে আছে। তাই আজ দেখা যায়, বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে এখন প্রধান দুই অ্যাক্টর হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। এ দুই দেশই বাংলাদেশকে তাদের প্রভাব বলয়ে রাখতে চায়। আর ভৌগোলিক সংলগ্নতার কারণে ভারত সবসময় বাংলাদেশের ওপর প্রভুত্ব বজায় আগ্রহী। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এশিয়া তথা ভূমণ্ডলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। কত গুরুত্বপূর্ণ এ অবস্থান, সেটি আমি কিছুক্ষণ পরে আলোচনা করব। অথচ স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বাংলাদেশ পরাশক্তিদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এ ব্যাপারে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যুগান্তরের পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করছি। ১৯৯৬ সালের একেবারে গোড়ার দিকে মার্কিন দূতাবাস আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাদের তৎকালীন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এক কাপ চা খাওয়ার দাওয়াত করে। তখন আমি দৈনিক ‘ইনকিলাবের’ বিশেষ সংবাদদাতা এবং নিয়মিত কলামিস্ট। যথারীতি সেখানে যাই। আমাকে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে তিনজন সুধীকে দেড় মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। আমি রাজি থাকলে যেন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করি। সেখানেই জানলাম, ওই তিনজনের আরেকজন হলেন সাবেক সচিব মরহুম শাহ আবদুল হান্নান। আমি ওই দাওয়াত কবুল করি এবং ১৯৯৬ সালে দেড় মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফর করি। এটিই ছিল আমার প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। উল্লেখ করা যেতে পারে, আমি কোনোদিন কোনো দূতাবাসে যাইনি এবং এখনো যাই না। কোনো আচার অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেলে সেটি ভিন্নকথা। মার্কিন দূতবাসে প্রাথমিক আলাপে অনেক কথাই হয়। আমি প্রাসঙ্গিকভাবে জিজ্ঞাসা করি, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব কতখানি? তখন রাষ্ট্রদূত তার পেছনে টাঙানো বিশ্বমানচিত্রের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একটি ছড়ি দিয়ে তিনি বাংলাদেশ দেখান এবং বলেন, তোমাদের দেশ কত ছোট এবং কত অনুন্নত। মার্কিন সরকার যেসব দেশকে প্রায়োরিটি দেয়, তার মধ্যে বাংলাদেশ পড়ে না। তারপর ৩০ বছর পার হয়েছে। সেদিন আর নেই। আগেই বলেছি, বাংলাদেশ এবার সেন্টার স্টেজে এসেছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় বাংলাদেশের এত গুরুত্ব। বাংলাদেশ এখন একটি দক্ষিণ এশীয় দেশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ না হয়েও দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হলো বাংলাদেশ। এটিই হলো বাংলাদেশের নবলব্ধ ভূরাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত গুরুত্বের কারণ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যায়। একুশ শতকের শুরু থেকেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পলিটিক্যাল রাডারে রয়েছে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাদের এ ভূমিকায় একটি কার্যকর ইনস্ট্রুমেন্ট ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ। এ তিন শক্তি মিলে সিদ্ধান্ত করে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ জন্য বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জিতিয়ে ক্ষমতায় বসাতে হবে। এবং তাই করা হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখছিল। তাই ওই নির্বাচনের পর ভারত আপার হ্যান্ড পায় এবং হাসিনার সরকারও ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতের চরণ তলে নিজেকে বিসর্জন দেয়। যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশে ভারতের প্রভুত্বকে মেনে নেয়। ২০১২ সালে বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনকে পছন্দ করতেন না; কিন্তু ভারতকে খুশি রাখার জন্য তিনি খামোশ থাকেন। কিন্তু ২০২১ সালে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। এ পয়েন্টে বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে হাসিনা সরকারের বিরোধ শুরু হয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে এতটা গুরুত্ব দেন যে, আওয়ামী লীগ ঠারে ঠুরে বলতে থাকে যে, পিটার হাস বিরোধী দলকে সমর্থন করেন।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রাজনীতি এবং ভূরাজনীতিতে ইউটার্ন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান প্রফেসর ইউনূসকে মার্কিনপন্থি মনে করা হলেও বিপ্লবের স্পিরিট মোতাবেক তিনি বাংলাদেশকে ভারতের আধিপত্যবাদী শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে ড. ইউনূসের অর্থনৈতিক দর্শন মোতাবেক বঙ্গোপসাগর এবং ভারতের সেভেন সিস্টার্স ড. ইউনূসের কাছে উন্নয়নের সিঁড়ি বলে প্রতিভাত হয়। তিনি প্রকাশ্যেই বলেন, বঙ্গোপসাগরের প্রধান পাহারাদার হলো বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগর থেকে সেভেন সিস্টার্স হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত হবে উন্নয়নের মহাসড়ক। এ ফর্মুলা তিনি চীন সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিংয়ের কাছে তুলে ধরেন। ধারণা পাওয়া যায়, চীনের কাছে ড. ইউনূসের এ অর্থনৈতিক দর্শন গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে।
ওদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারতের প্রভাব দূরীভূত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নাখোশ হয়নি। তবে এবার আর তারা বাংলাদেশকে ভারতের চোখে না দেখে সরাসরি নিজেদের লেন্স দিয়ে দেখতে শুরু করে। এর ফলে অবধারিতভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভেতর স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক এবং সামরিকভাবে খুব বেশি করে চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। চীন এ এলাকায় তথা ভূরাজনীতিতে নিজের প্রভাববলয় বৃদ্ধি করার জন্য ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’, সংক্ষেপে ‘বিআরআই’ প্রমোট করা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রও পালটা ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ নিয়ে অগ্রসর হয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ‘বিআরআই’-এ যোগ দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বারবার চাপ দিলেও বাংলাদেশ মার্কিন মডেলের ইন্দো প্যাসিফিকে যোগ দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশ সম্পর্কে ওয়ান-টু-ওয়ান পলিসি গ্রহণ করেছে। এ পলিসি তারা বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে বাংলাদেশে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের মাধ্যমে। উল্লেখ্য, ক্রিস্টেনসেনের আগে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসে সিনিয়র কূটনীতিক হিসাবে কাজ করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে তার ২০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত হিসাবে তার নিয়োগের কনফার্মেশনের জন্য সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটিতে যে শুনানি হয়, সেখানে তিনি যে সাক্ষ্য দেন, সেখানে কথাগুলো বলেন একেবারে সরাসরি। সাক্ষ্যের এক স্থানে তিনি বলেন, (বাংলা অনুবাদ) ‘এ মাসে (অক্টোবর ২০২৫) বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার চীন থেকে ২০টি জে-১০ জঙ্গিবিমান কেনার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। তারা ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং রাডার ক্রয়েরও চুক্তি অনুমোদন করেছে। এগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে চীনের ওপর বাংলাদেশের সামরিক নির্ভরতা আরও গভীর হবে, যেটি আমরা ঠেকাব কীভাবে?’ বাংলাদেশের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কী চায়, সেটি ওপরের এ সাক্ষ্য থেকে পরিষ্কার। কিন্তু চীনও বসে নেই। ভারত তিস্তা পানিবণ্টন ইস্যুকে দশকের পর দশক ঝুলিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল যাতে শুষ্ক না হয়, তার জন্য তারা তিস্তা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করার আগ্রহ দেখিয়েছে। তিস্তা প্রজেক্ট শুধু একটি বাঁধ নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং সেটিকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলে তিস্তাসংলগ্ন একটি মহানগরীসম জনপদ গড়ে উঠবে। শেখ হাসিনার আমলে এ প্রজেক্টে বাগড়া দিয়েছে ভারত। ড. ইউনূস চীনকে এ প্রজেক্ট দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু তিনি তাদের বলেছেন, এতবড় একটি প্রজেক্ট তিনি তাদের না দিয়ে বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষমাণ রাখছেন। নির্বাচনের আগে চীন সফরের সময় মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে চীনের সহায়তায় তারা তিস্তা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করবেন। নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে দুই-তৃতীয়াংশের মতো বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতায়। ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশে আসার পরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র সরবরাহ করতে চায়। আবার ওইদিকে চীন ও পাকিস্তান থেকে জে-১০ ও জে-১৭ থান্ডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডার কেনার আলোচনাও চলমান। তবে এ সরকারের আমলে সেই আলোচনা চলমান কি না জানা যায়নি। বাংলাদেশে চীনের প্রবল উপস্থিতি ভারতের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল উপস্থিতি ভারতে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, সেটি এখনো জানা যায়নি। বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের আতিশয্যকে যদি বাংলাদেশ মূল্য না দেয়, তাহলে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাপান ইত্যাদি দাতাসংস্থা এবং দাতাদেশের ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যেই ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-এর কিস্তির টাকা প্রদান আটকে গেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খালি হাতে ফিরে এসেছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল হালিম সাগর সম্পাদকীয় কার্যালয় : ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা) টিকাটুলি ঢাকা ১২০৩। ফোন : 01722-062274, 01715-496849, ই- মেইল halimshagor2000@gmail.com Banglasangbad1@gmail.com dainikbanglasangbadbd@gmail.com সিলেট অফিস :-৪০৬ রংমহল টাওয়ার,(৪র্থ তলা) বন্দর বাজার সিলেট ৩১০০। ফোন : 01972-062274। Canada office : 35 bexhilAve Scarborogh. Toranto. canada.
Design & Development By HosterCube Ltd.