
নিজস্ব প্রতিবেদক: জুলাই বিপ্লবের পর দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশে শুরু হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দেশের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, নবগঠিত বগুড়াসহ ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ এবং ৬১টি জেলা পরিষদের নির্বাচন চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে শুরু হতে পারে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিএনপি সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছিল— আসলে কি নির্বাচন হবে, নাকি প্রশাসক দিয়েই বাকি মেয়াদ পার করা হবে? তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট বক্তব্যের পর সব জল্পনার অবসান ঘটেছে এবং একই সাথে নির্বাচন আয়োজনের আনুষ্ঠানিক চিঠি না পেলেও নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি কার্যক্রমে ব্যাপক গতি এসেছে। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া দেশের প্রায় সব স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রশাসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই দেশের সব অঞ্চলের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন করেছে। প্রতি তিন মাসে দুটি ধাপের ভোট সম্পন্ন করার একটি মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে কমিশন। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম যেমন ভোটার তালিকা, ব্যালট বাক্স, সিল, গালা ও বস্তা ইত্যাদি প্রস্তুত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনাও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে চূড়ান্ত করা হবে। ইসি সচিবালয় স্পষ্ট করেছে যে, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার করা হবে না, সম্পূর্ণ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে সনাতন কাগজের ব্যালটের মাধ্যমে। এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সবচেয়ে বড় আইনি পরিবর্তন হলো এই ভোট সম্পূর্ণ নির্দলীয় বা দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে। সংসদে এ সংক্রান্ত সংশোধিত আইন পাস হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন এখন আচরণবিধি চূড়ান্ত করার কাজ করছে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক দলের প্রতীকের ওপর ভিত্তি করে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। এমনকি নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের পোস্টারও না রাখার পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কমিশন। এই আইন ও আচরণবিধির নতুন খসড়ার ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত জানতে আজ ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনার পর চলতি জুনের মধ্যেই খসড়াটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে এবং পরবর্তী ১৫ দিন তা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং ও সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে জুলাইয়ের মধ্যে সব আইনি সংস্কার শেষ করে আগামী আগস্ট মাসেই অন্তত একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করতে চায় নির্বাচন কমিশন। সারাদেশে এই বিশাল নির্বাচনী কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে সরকারের কাছে নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় দুই হাজার ৯০০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ চেয়েছে ইসি, যা আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাওয়া বাজেটে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কমিশনের সামগ্রিক হিসাব অনুযায়ী, দেশের সবকটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ভোট শেষ করতে মোট সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের জন্য দুই হাজার ৯০০ কোটি, উপজেলা পরিষদের জন্য দুই হাজার কোটি, সিটি করপোরেশনের জন্য ৩৩০ কোটি এবং পৌরসভার জন্য ৩০০ কোটি টাকার চাহিদা রয়েছে। তবে বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরাদ্দ করা অর্থের মধ্যে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়ায়, এবারও অপ্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যয় না করে কঠোর কৃচ্ছ্রতাসাধন নীতি অবলম্বন করতে চায় কমিশন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বর্ষা মৌসুমের পরিস্থিতি এবং বছর শেষে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে অক্টোবর থেকে মার্চের উপযুক্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে এই ভোট সম্পন্ন করা হবে। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের পর এই প্রথম বড় কোনো রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে বিএনপি। দীর্ঘদিন পর মাঠপর্যায়ের এই ভোটগুলোতে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান আরও সুসংহত করতে দলের হাইকমান্ড অত্যন্ত সতর্ক ও কৌশলী পদক্ষেপ নিচ্ছে। যেহেতু এই ভোটগুলো দলীয় প্রতীক ছাড়া হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাই বিএনপির জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ সামলানো। একই এলাকায় দলের একাধিক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী প্রার্থী দাঁড়িয়ে গেলে যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অভ্যন্তরীণ বিভেদ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে দলটির হাইকমান্ড কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ফলে তাড়াহুড়ো না করে আগে মাঠ গোছানোর দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকেরা। তৃণমূলের কোন্দল এড়াতে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রতিটি এলাকায় এখন থেকেই ‘একক যোগ্য প্রার্থী’ নির্বাচন বা আপস-সমঝোতা তৈরি করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান এ বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন যে, এবারের নির্বাচনে কোনো বিতর্কিত নেতাকে ছাড় দেওয়া হবে না। দলের ত্যাগী এবং ‘ক্লিন ইমেজধারী’ নেতারাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অগ্রাধিকার পাবেন এবং এর বাইরে কেউ দলীয় নির্দেশ অমান্য করে প্রার্থী হলে বা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে চরম কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুও জানিয়েছেন যে, একটি বড় দল হিসেবে একেকটি এলাকায় একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকতেই পারেন, তবে তাদের মধ্যে কীভাবে চমৎকার সমন্বয় করা যায়, সেসব বিষয় নিয়ে শীর্ষ নেতারা কাজ করছেন এবং অনেক যোগ্য প্রার্থীকে ইতিমধ্যেই অভ্যন্তরীণভাবে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। বিএনপির সাংগঠনিক অভিভাবক ও দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব বিষয়ে প্রতিনিয়ত খোঁজখবর রাখছেন এবং অচিরেই একটি শক্তিশালী ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটি’ গঠন করা হতে পারে। দলের ভেতরের শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি বিএনপির হাইকমান্ড আরেকটি বিষয়ে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে, যেন রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা হয়ে পড়া প্রতিপক্ষরা ভিন্ন কৌশলে স্বতন্ত্র প্রার্থী সেজে বা ছদ্মবেশে স্থানীয় সরকারে জায়গা করে নিতে না পারে। পরিস্থিতি এবং কৌশলগত অবস্থান বিবেচনা করে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোকে কিছু কিছু জায়গায় ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে ক্ষমতাসীনদের।
যদিও কেন্দ্রীয়ভাবে এখনো নির্বাচনের সুস্পষ্ট তফসিল ঘোষণা করা হয়নি, তবে মাঠপর্যায়ে এর মধ্যেই নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বিএনপির স্থানীয় ও তৃণমূলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই এলাকায় গণসংযোগ ও নিয়মিত যোগাযোগ ব্যাপক হারে বাড়িয়ে দিয়েছেন। ভোটারদের দোয়া ও সমর্থন চেয়ে নির্বাচনী এলাকায় ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারের মাধ্যমে জোরেশোরে আগাম প্রচারণা চালানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পুনরায় সক্রিয় করার এবং দলের সাংগঠনিক ভিত্তি একদম শিকড় পর্যায় থেকে জোরদার করার একটি বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে এই নির্বাচনকে দেখছে বিএনপির হাইকমান্ড।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল হালিম সাগর সম্পাদকীয় কার্যালয় : ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা) টিকাটুলি ঢাকা ১২০৩। ফোন : 01722-062274, 01715-496849, ই- মেইল halimshagor2000@gmail.com Banglasangbad1@gmail.com dainikbanglasangbadbd@gmail.com সিলেট অফিস :-৪০৬ রংমহল টাওয়ার,(৪র্থ তলা) বন্দর বাজার সিলেট ৩১০০। ফোন : 01972-062274। Canada office : 35 bexhilAve Scarborogh. Toranto. canada.
Design & Development By HosterCube Ltd.