
ফিরাজ আহম্মেদ মোল্লা : দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার সর্বোচ্চ ভরসাস্থল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরের বড় বড় সরকারি হাসপাতালগুলো এখন এক মরণঘাতী দালাল সিন্ডিকেটের দখলে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা অসহায়, দরিদ্র রোগী ও তাদের স্বজনদের আইসিইউ (ওঈট), এনআইসিইউ (ঘওঈট) শয্যা সংকট এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনকে পুঁজি করে অলিগলির নামসর্বস্ব, অনুমোদনহীন বেসরকারি ক্লিনিকে পাচার করা হচ্ছে। চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই অশুভ বাণিজ্যে নিঃস্ব হচ্ছে হাজারও পরিবার। খোদ রাজধানীসহ দেশের আটটি বিভাগীয় শহরের অসাধু ক্লিনিক ব্যবসায়ী ও সরকারি হাসপাতালের একশ্রেণীর অসাধু কর্মচারীদের যোগসাজশে এই চক্র দিনে দিনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষণস্থায়ী অভিযানে আটকের পর জামিনে বের হয়ে অপরাধীরা আবারও একই খেলায় মেতে উঠছে। সম্প্রতি রাজধানীর শ্যামলীর একটি ভবনের সপ্তম তলায় গড়ে ওঠা ‘বেবি কেয়ার’ নামক একটি তথাকথিত হাসপাতালে অক্সিজেন গ্যাস লিকেজের ঘটনায় এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু এই জিম্মিদশার বীভৎস রূপটি সবার সামনে এনেছে। কাগজ-কলমে এটি ২০ শয্যার হাসপাতাল হলেও বাস্তবে কোনো সাধারণ বেড সেখানে নেই। দুটি ছোট কক্ষে এনআইসিইউ ও পিআইসিইউ (চওঈট) মিলিয়ে ১০টি বেড নিয়ে চলছে পুরো বাণিজ্য। গত ২১ জুন ঢামেক হাসপাতালে সিজারের মাধ্যমে পুত্রসন্তানের জন্ম দেওয়া মুক্তা বেগমকে তার নবজাতকের শ্বাসকষ্টের অজুহাতে এনআইসিইউ খালি নেই বলে ভয় দেখিয়ে দালালেরা এই হাসপাতালে পাঠায়। স্বজনদের প্রতিদিন ৮ হাজার টাকা খরচের কথা বলা হলেও মাত্র তিন দিনেই প্রায় ৫০ হাজার টাকা বিল চাপানো হয়। গত ২৩ জুন গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দে চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে অন্য শিশুদের পাশের আরেকটি ক্লিনিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। স্বজনরা শিশুকে নিয়ে চলে যেতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে বাধা দেয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই একই ভবনের চতুর্থ তলায় অবস্থিত ‘ডক্টরস কেয়ার হাসপাতাল’ ভিউ চিকিৎসকের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার পরিচালনার অপরাধে কিছুদিন আগেই স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী সিলগালা করে এসেছিলেন। অথচ একই ভবনে বহাল তবিয়তে ‘বেবি কেয়ার’ ও ‘হাই কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল’সহ মোট ছয়টি হাসপাতাল ও তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার চলছে। এসব ক্লিনিকে কোনো স্থায়ী চিকিৎসক নেই, নেই সুনির্দিষ্ট জনবল। সরকারি হাসপাতালের কিছু চিকিৎসকের শেয়ার থাকার কারণে তারা মাঝেমধ্যে এসে রোগী দেখে যান, বাকি সময় নার্স বা আয়াদের দিয়েই চলে লাইফ সাপোর্টের মতো সংবেদনশীল চিকিৎসা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ২১১ নম্বর এনআইসিইউ ওয়ার্ড এবং ২১২ নম্বর গাইনি ওয়ার্ড ঘিরে ৮ থেকে ১০টি শক্তিশালী দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। ঢামেক থেকে নির্দিষ্ট কোনো প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী পাচার করতে পারলে চক্রটি রোগীপ্রতি ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত মোটা অঙ্কের কমিশন পায়। এই রক্তের টাকা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ধাপে ভাগ হয়। এর মধ্যে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স চালক পায় ২ হাজার টাকা, সরাসরি ফুসলে নেওয়া দালাল পায় ২ হাজার টাকা, হাসপাতালের সিনিয়র চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী (ওয়ার্ডবয় বা ая) পায় ৪ হাজার টাকা এবং ট্রলিতে করে রোগীকে হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার মূল কাজটির জন্য ট্রলিম্যানরা পায় প্রায় ৬ হাজার টাকা। এই ট্রলিম্যানদের মধ্যে কেউ সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত, কেউ দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মী, আবার কেউ বহিরাগত হয়েও নিজেদের হাসপাতালের বড় কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে স্বজনদের আস্থা অর্জন করে। রাজধানীর বিভিন্ন নামসর্বস্ব ক্লিনিকে রোগী সরবরাহের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু গ্রুপ কাজ করছে। রামপুরার মাল্টিকেয়ার হাসপাতালের হয়ে শাহাদাতের নেতৃত্বে জাহিদ ও আনিস; কাঁটাবনের হোমকেয়ার, চানখাঁরপুলের রয়েল কেয়ার এবং যাত্রাবাড়ীর প্যারামাউন্ট হাসপাতালের জন্য রাব্বি; শ্যামলীর সিটি কেয়ার ও হাই কেয়ারে রনি এবং পান্থপথের ইউনি হেলথ কেয়ারের জন্য মনির ও বাধন নামের দালালেরা ২৪ ঘণ্টা ঢামেক চত্বরে ওত পেতে থাকে। জরুরি বিভাগে সর্দার স্বপন ও মনছুরের নেতৃত্বে এবং ওয়ার্ডগুলোতে, শাওন, রাজীব, কাশেম ও কালামের সিন্ডিকেট রোগীদের বিভ্রান্ত করার মূল কাজটি করে। দালালদের এই নিষ্ঠুর প্রতারণার শিকার হয়ে গত ১ জুন প্রাণ হারিয়েছেন কুমিল্লার দাউদকান্দিতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার ২২ বছর বয়সী যুবক মারুফ। তার বন্ধুরা ঢাকার কিছু না চেনায় ঢামেকের জরুরি বিভাগের সামনে ওত পেতে থাকা দালালেরা নিজেদের হাসপাতালের কর্মী পরিচয় দিয়ে জানায়, মারুফের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং ঢামেকে আইসিইউ খালি নেই। দ্রুত তাদের পরিচিত একটি ক্লিনিকে নিয়ে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পরদিনই মাথায় অস্ত্রোপচারের নামে তিন লাখ টাকা দাবি করা হয় এবং পরদিন সকালে মারুফ মারা যান। মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চার লাখ টাকার ভুতুড়ে বিল ধরিয়ে দেয়। টাকা পরিশোধ করতে না পারায় দীর্ঘ আট ঘণ্টা মারুফের লাশ আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীদের হস্তক্ষেপে দুই লাখ টাকা দিয়ে পরিবার লাশ উদ্ধার করে। একই চিত্র দেখা গেছে বাসের ধাক্কায় আহত বুলবুল আহমেদের ক্ষেত্রেও। তাকে কাঁটাবনের হোম কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে পাঁচ দিনেই ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকার আইসিইউ বিল ধরানো হয়েছে। টাকা পরিশোধ না করায় রোগীকে সাধারণ বেডেও দেওয়া হচ্ছে না, উল্টো স্বজনদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। ঢামেক ও ঢাকার এই চিত্র বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও একই কায়দায় ভুয়া ক্লিনিকের জালিয়াতি চলছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সামনে এবং পাঁচলাইশ এলাকায় গড়ে উঠেছে ব্যাঙের ছাতার মতো ক্লিনিক। চমেকের জরুরি বিভাগ ও ওটি (ঙঞ) কমপ্লেক্স থেকে দালাল ও ল্যাব টেকনিশিয়ানদের সিন্ডিকেট পরীক্ষা-পরীক্ষা ও আইসিইউর নাম করে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাচার করছে। সেখানে ভুয়া এনেস্থেসিয়া ডাক্তার দিয়ে অস্ত্রোপচার করার সময় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা নিত্যদিনের। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কেন্দ্র করে রিকশাচালক ও সিএনজিচালকদের একটি বড় অংশকে দালাল হিসেবে ব্যবহার করছে স্থানীয় কিছু ক্লিনিক। হাসপাতালের ভেতরে ডাক্তারদের সংকটের কথা বলে জৈন্তাপুর, কানাইঘাট থেকে আসা সরল মানুষদের অলিগলির নামসর্বস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে পকেট কাটা হচ্ছে। রাজশাহী মেডিকেল (রামেক) ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দা এবং শয্যা সংকটকে পুঁজি করে আইসিইউ বাণিজ্যের এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। ক্লিনিকগুলোর কোনোটিতেই লাইসেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেই। শুধু এসি রুম আর লাইট জ্বালিয়ে সেগুলোকে আইসিইউ বা সিসিইউ (ঈঈট) দাবি করে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বিল আদায় করা হচ্ছে। খুলনা মেডিকেল ও বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে ট্রলিম্যান ও গেটম্যানদের সিন্ডিকেট সরাসরি রোগীদের অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগী সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা পাওয়ার যোগ্য হলেও দালালরা তাদের অলিগলির ক্লিনিকে নিয়ে লাইফ সাপোর্টে ঢুকিয়ে দেয় এবং পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে লাশ আটকে রাখে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে কোনো বিশেষজ্ঞ সার্জন ছাড়াই ইন্টার্ন বা ভুয়া ডাক্তার দিয়ে জটিল সিজারিয়ান অপারেশন করানোর প্রমাণ পেয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। দালালদের এই ক্রমবর্ধমান দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন কঠোর অবস্থানে। সম্প্রতি র্যাব-২ এর উদ্যোগে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এবং পঙ্গু হাসপাতালে একযোগে দালাল বিরোধী চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযান শেষে র্যাব-২ এর উপ-অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি খালিদুল হক হাওলাদার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, “সরকারি হাসপাতালে আসা অসহায় রোগীদের ফুসলিয়ে বেসরকারি নামসর্বস্ব ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া এবং অপচিকিৎসার মাধ্যমে অঙ্গহানি ঘটানো একটি চরম ফৌজদারি অপরাধ। আমরা তিনটি হাসপাতাল থেকে হাতেনাতে ২০ জন দালালকে আটক করেছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাত দফা কর্মসূচির আলোকে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং দালালদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। প্রয়োজনে মানব পাচার আইনেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” ধারণক্ষমতার চেয়ে ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি রোগীর অতিরিক্ত চাপই এই সংকটের মূল কারণ বলে মনে করছেন হাসপাতাল পরিচালকেরা। ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “আমাদের এখানে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০টি সিজার হয়, কিন্তু সেই তুলনায় এনআইসিইউর সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। নিউরোসায়েন্সের ওটিতে সার্বক্ষণিক অপারেশন চললেও দিনে সর্বোচ্চ দুইজনকে আমরা আইসিইউ সাপোর্ট দিতে পারি। এই তীব্র শয্যা সংকটকে পুঁজি করেই দালাল চক্র স্বজনদের ফাঁদে ফেলে। এদের দমনে আনসার ও গোয়েন্দা সংস্থা নিয়োগ করা হলেও তারা জামিনে বের হয়ে আবার একই কাজে লিপ্ত হয়।” স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, “সুনির্দিষ্ট এবং লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়। তবুও আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে একাধিক ক্লিনিক সিলগালা করেছি এবং এই অসাধু চক্র নির্মূলে আমাদের ঝটিকা অভিযান অব্যাহত থাকবে।” সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, “দেশের ৫০০ শয্যার হাসপাতালে যেখানে ১৫০০ এবং ১৫০০ শয্যার হাসপাতালে ৪ হাজার রোগী থাকে, সেখানে শয্যা ও অবকাঠামোর এই অপ্রতুলতার সুযোগ চতুর দালালরা নেবেই। সাধারণ মানুষের অসচেতনতা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতাও এর জন্য দায়ী। এটি একটি বহুমাত্রিক ও গভীর সমস্যা, যার সমাধান একদিনে সম্ভব নয়। একদিকে যেমন আমাদের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা ও সরবরাহ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে এই দালাল সিন্ডিকেট ও লাইফ সাপোর্ট বাণিজ্যকে চিরতরে উপড়ে ফেলতে হবে।”
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল হালিম সাগর সম্পাদকীয় কার্যালয় : ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা) টিকাটুলি ঢাকা ১২০৩। ফোন : 01722-062274, 01715-496849, ই- মেইল halimshagor2000@gmail.com Banglasangbad1@gmail.com dainikbanglasangbadbd@gmail.com সিলেট অফিস :-৪০৬ রংমহল টাওয়ার,(৪র্থ তলা) বন্দর বাজার সিলেট ৩১০০। ফোন : 01972-062274। Canada office : 35 bexhilAve Scarborogh. Toranto. canada.
Design & Development By HosterCube Ltd.