
আব্দুল হালিম সাগর: অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সম্প্রসারিত তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল করে ১৯৯৪ সালের তিন দশক পুরোনো নীতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারের এই পদক্ষেপে ওষুধ কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সাধারণ মানুষের জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা চরম ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের জনস্বাস্থ্য, ওষুধ ও স্বাস্থ্য-অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘ ৩২ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের মানুষের বর্তমান স্বাস্থ্য চাহিদা এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি বিবেচনায় নিয়ে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ১১৭টি থেকে বাড়িয়ে ২৯৭টিতে উন্নীত করেছিল। একই সঙ্গে ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত দাম নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন ও যুগোপযোগী পদ্ধতি চালু করা হয়। তবে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ না নিয়ে এই তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি প্রণয়ন করায় তা পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে বাতিল করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ১৯৯৪ সালের ১১৭টি ওষুধের পুরোনো তালিকা এবং তৎকালীন সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাই দেশে বহাল থাকবে। সরকারি এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করে জনস্বাস্থ্য ও ওষুধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিতে কোনো আইনি বা পদ্ধতিগত ত্রুটি থেকে থাকলে তা দ্রুত সংশোধন বা পরিমার্জন করার পথ খোলাই ছিল। তা না করে হুট করে তিন দশক আগের পুরোনো তালিকায় ফিরে যাওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সম্পূর্ণ বিপরীত এবং একটি ঠুনকো অজুহাত মাত্র। বিশেষজ্ঞরা জানান, ১৯৯৪ সালের তালিকার ১১৭টি ওষুধের মধ্যে বর্তমানে বাজারে সাকুল্যে ৩০টির মতো ওষুধ উৎপাদিত হয় এবং বাকিগুলোর উৎপাদন বন্ধ বা অপ্রচলিত হয়ে গেছে। তাছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো জটিল রোগের আধুনিক ওষুধ এই পুরোনো তালিকায় একদমই নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান ও জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক ড. জাকির আহমেদ চৌধুরী জানান, অন্তর্বর্তী সরকার নানা দিক বিচার-বিশ্লেষণ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার মাধ্যমেই ২৯৭টি ওষুধের নতুন তালিকা প্রস্তুত করেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা না করেই একতরফাভাবে এই বিশাল তালিকা বাতিল করেছে, যা নীতিগতভাবে সঠিক হয়নি। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সুফিয়ান নাহিন শিমুল মনে করেন, এই সিদ্ধান্তে স্পষ্টতই সাধারণ জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করে ওষুধ কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক সুবিধাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কড়া নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি না থাকায় কোম্পানিগুলো নিজেদের মতো দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আকতার হোসেন স্পষ্ট জানান যে ৩০-৩২ বছর আগের মাত্র ৩০টি কার্যকর ওষুধ দিয়ে বর্তমান যুগের জটিল ও বহুমুখী স্বাস্থ্যঝাঁকি মোকাবিলা করা বাস্তবে অসম্ভব। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন জানান, বিগত সরকার ওষুধ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারও পরামর্শ না নিয়ে একতরফাভাবে ওই তালিকা নির্ধারণ করেছিল। তাই তারা শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। বেসরকারি খাতের ওপর তা চাপিয়ে না দিয়ে সরকার চাইলে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডিসিএলের মাধ্যমে চাহিদা মেটাতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। গত ১০ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সিনিয়র সহকারী সচিব রফিকুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও দাম নির্ধারণ সংক্রান্ত পাঁচটি আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় নতুন তালিকা প্রণয়ন ও দাম পুনর্বিবেচনা করা হবে—সে বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুততম সময়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও আধুনিক তালিকা প্রণয়ন করা না গেলে দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা খরচ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল হালিম সাগর সম্পাদকীয় কার্যালয় : ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা) টিকাটুলি ঢাকা ১২০৩। ফোন : 01722-062274, 01715-496849, ই- মেইল halimshagor2000@gmail.com Banglasangbad1@gmail.com dainikbanglasangbadbd@gmail.com সিলেট অফিস :-৪০৬ রংমহল টাওয়ার,(৪র্থ তলা) বন্দর বাজার সিলেট ৩১০০। ফোন : 01972-062274। Canada office : 35 bexhilAve Scarborogh. Toranto. canada.
Design & Development By HosterCube Ltd.