
আব্দুল হালিম সাগর : বিশেষ ছাড়, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং তথাকথিত ‘বিশেষ এক্সিট’ সুযোগ—ব্যাংকিং খাতকে সুপথে ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তার অভাব ছিল না। তবে নানা সুবিধা ও ছাড়ের পরও লাগাম টানা যাচ্ছে না খেলাপি ঋণের। বরঞ্চ ছাড়ের সুযোগ নিয়ে খেলাপির চিত্র দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপির পরিমাণ এবার রেকর্ড গড়ে ৬ লাখ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করেছে। আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঋণের মান নির্ধারণ ও অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবে অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ চিহ্নিত হতে শুরু করায় এই আড়ালে থাকা খেলাপি ঋণ প্রকাশ্যে আসছে। ফলে ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর ও নাজুক চিত্র আবারও উন্মোচিত হয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তৈরি করেছে গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের জুন প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বর্তমানে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি। সহজ কথায়, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা ৭৮ পয়সা খেলাপি হয়ে গেছে। ব্যাংকাররা বলছেন, এই খেলাপির সিংহভাগই মন্দ বা ক্ষতিজনক ক্যাটাগরির, অর্থাৎ যা গাণিতিকভাবে আদায় অযোগ্য। এর আগে চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা এবং খেলাপির হার ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরে শ্রেণিকৃত ঋণের বৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক। ২০২৪ সালের জুনে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুন শেষে তা এক লাফেই বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৭ কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা খেলাপি ঋণের এই চড়া হারের নেপথ্যে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছিল। ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে নেওয়া এসব ঋণ দীর্ঘদিন ধরে নানা কায়দায় কাগজে-কলমে ভালো বা নিয়মিত হিসেবে দেখানো হয়। বর্তমানে তদারকি জোরদার করায় সেই ভুয়া ও অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণগুলোর আসল মান সামনে আসছে। এছাড়া আগে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ লুকানোর জন্য বিভিন্ন সহজ শর্ত দেওয়া হতো। সম্প্রতি ঋণের শ্রেণিকরণের নিয়মাবলী আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করায় আদায়হীন ঋণ দ্রুত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করে খেলাপি তালিকা থেকে নাম কাটানোর যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদে কাজে আসেনি। সাময়িক ছাড় পেয়েও ঋণগ্রহীতারা কিস্তি পরিশোধ না করায় আগের পুনঃতফসিল করা ঋণগুলো এখন একযোগে খেলাপিতে রূপ নিচ্ছে। খেলাপি ঋণের এই লাগামহীন বৃদ্ধি কেবল ব্যাংকের নথিপত্রে সীমাবদ্ধ নেই, তা পুরো দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। গ্রাহকের আমানত থেকে দেওয়া ঋণ ফেরত না আসায় ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকার বা তারল্যের তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। অনেক ব্যাংক দৈনন্দিন লেনদেন চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকগুলোকে তাদের মুনাফা থেকে নির্দিষ্ট হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হয়। খেলাপি লাফিয়ে বাড়ায় সিংহভাগ ব্যাংকের মুনাফা কমে যাচ্ছে এবং তারা মারাত্মক প্রভিশন ঘাটতিতে পড়ছে। একই সাথে ব্যাংকে টাকা আটকে থাকায় ভালো ও সম্ভাবনাময় নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশে নতুন কারখানা স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়ে পড়েছে। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন ব্যাংকিং খাতের এই লাগামহীন বৃদ্ধিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, দেশে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব ও সুশাসনের চরম ঘাটতির কারণে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণের প্রবণতা মহামারী আকার ধারণ করেছে। এর সরাসরি প্রভাবে ব্যাংকে তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য আড়াল করে রাখা হয়েছে। সব ব্যাংকের প্রকৃত ও নিরপেক্ষ অডিট ডেটা সামনে এলে এই অংক আরও অনেক বাড়বে। তাই কোনো বিশেষ ছাড় না দিয়ে এখনই ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং আড়াল না করে দ্রুত আদায়যোগ্য ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ কমানোকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তিনি জানান, বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খেলাপি ঋণ কমাতে ও ব্যাংকিং খাতকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনতে একাধিক নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্ভাবনাময় কিন্তু সাময়িক সংকটে পড়া ব্যবসাগুলোকে ধরে রাখতে এবং তাদের ঋণ আদায়যোগ্য করতে বিশেষ এক্সিট পলিসি ও পুনঃতফসিলের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অতীতে লুকিয়ে রাখা খেলাপি ঋণের সত্যিকারের তথ্য প্রকাশ করাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গুরুত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে শ্রেণিকরণ করায় সাময়িকভাবে সংখ্যাটি বড় মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনবে।
বিশেষ ছাড়ের নীতি যে খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যর্থ হয়েছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে স্পষ্ট। অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল নীতিগত ছাড়ের ওপর নির্ভর না করে খেলাপি ঋণের দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচতে অর্থঋণ আদালতগুলোকে আরও কার্যকর করা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ বাজেয়াপ্তসহ দ্রুত আইনি ফয়সালা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অসাধু হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং ভুয়া ঋণ অনুমোদনের সাথে জড়িত ব্যাংকারদের শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। নীতিগত ছাড়ের সুযোগ যেন কেবল প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা পান এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হয়, তা নিশ্চিত করতে না পারলে এই সংকট উৎরানো অসম্ভব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল হালিম সাগর সম্পাদকীয় কার্যালয় : ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা) টিকাটুলি ঢাকা ১২০৩। ফোন : 01722-062274, 01715-496849, ই- মেইল halimshagor2000@gmail.com Banglasangbad1@gmail.com dainikbanglasangbadbd@gmail.com সিলেট অফিস :-৪০৬ রংমহল টাওয়ার,(৪র্থ তলা) বন্দর বাজার সিলেট ৩১০০। ফোন : 01972-062274। Canada office : 35 bexhilAve Scarborogh. Toranto. canada.
Design & Development By HosterCube Ltd.