
আব্দুল হালিম সাগর :
আলেম-উলামার স্মৃতিবিজড়িত এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের চারণভূমি সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সীমান্তবর্তী জনপদে এখন বইছে উত্তপ্ত নির্বাচনী হাওয়া। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সীমান্তঘেঁষা এই জনপদে এখন বইছে উত্তপ্ত নির্বাচনী হাওয়া। প্রচারণায় মুখর রাজপথ থেকে গ্রামের অলিগলি। তবে এবারের নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিন হেভিওয়েট প্রার্থী, যাদের লড়াইকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গ্রামের অলিগলি সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ‘ত্রিমুখী লড়াই’। একদিকে জোটের হেভিওয়েট দুই আলেম প্রার্থী, অন্যদিকে জনপ্রিয়তার চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে থাকা বিএনপি ঘরানার স্বতন্ত্র প্রার্থী। এই তিন শক্তির লড়াইয়ে কে হাসবেন শেষ হাসি, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ভোটের মাঠের তিন ‘পাহাড়’: সিলেট-৫ আসনে এবারের লড়াইয়ে সম্মুখ সমরে আছেন তিন শক্তিশালী প্রার্থী: ১. মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক: জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং বিএনপি জোট মনোনীত প্রার্থী। জোটের ঐক্যবদ্ধ ভোটব্যাংক ও আলেম সমাজের একটি বড় অংশ তার মূল শক্তি। ২. মুফতি আবুল হাসান: জামায়াত জোটের মনোনীত প্রার্থী। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী এবং জকিগঞ্জের আঞ্চলিক ভোট ও নিজস্ব আদর্শিক ভোটারদের ওপর ভর করে তিনি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। ৩. মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন): চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি এবং বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী। দলীয় পদ হারালেও সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলে এবং তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে তিনি এবারের নির্বাচনের ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
পরিসংখ্যানের মতে সিলেট-৫ নির্বাচন অফিস সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, সিলেট জেলায় এই আসনেই ভোটার বৃদ্ধির হার সবচেয়ে কম হলেও আসনে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লক্ষ ৯ হাজার ৯৫৬ জন (পুরুষ ২,১১,৬৬৭ জন; মহিলা ১,৯৮,২৮৯ জন)।
ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ: কানাইঘাটে ৮১টি কেন্দ্রে ৪৫৬টি কক্ষ এবং জকিগঞ্জে ৭৭টি কেন্দ্রে ৪২৬টি কক্ষ। অর্থাৎ ১৫৮টি কেন্দ্রে মোট ৮৩১টি স্থায়ী ও ৫১টি অস্থায়ী ভোটকক্ষে ভোট গ্রহণ হবে।
উন্নয়নের আর্তি বনাম আঞ্চলিকতা স্থানীয় ভোটারদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা দীর্ঘকাল ধরে নদী ভাঙন, অনুন্নত রাস্তাঘাট এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে চরম অবহেলার শিকার। কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের সাধারণ মানুষ এবার প্রার্থীর আদর্শের চেয়ে এলাকার উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। দীর্ঘদিনের নদী ভাঙন সমস্যা, বেহাল রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অবহেলা থেকে মুক্তি পেতে চান তারা। দুই জোটের আলাদা প্রার্থী হওয়ায় ভোট ভাগাভাগির সুবিধা শেষ পর্যন্ত কে পান, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ভোটাররা এবার প্রার্থীর আদর্শের চেয়ে এলাকার সার্বিক উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে জকিগঞ্জ উপজেলার একটি প্রবণতা হলো ‘আঞ্চলিকতা’। বিগত নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, জকিগঞ্জের ভোটাররা নিজেদের উপজেলার প্রার্থীকে জেতাতে ঐক্যবদ্ধ হন। এবারও মুফতি আবুল হাসান সেই আঞ্চলিকতাকে কাজে লাগিয়ে এবং জকিগঞ্জের বড় ভোটব্যাংক নিজের বাক্সে নিতে মরিয়া। তবে কানাইঘাটের দুই হেভিওয়েট প্রার্থী উবায়দুল্লাহ ফারুক ও চাকসু মামুন সেই সমীকরণ ভাঙতে কতটুকু সফল হন, সেটাই দেখার বিষয়। জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটের মধ্যে আঞ্চলিকতার একটি প্রচ্ছন্ন লড়াই কাজ করে। জকিগঞ্জের ভোটাররা বরাবরই নিজেদের এলাকার প্রার্থীকে জেতাতে ঐক্যবদ্ধ হন। মুফতি আবুল হাসান সেই আঞ্চলিকতাকে কাজে লাগিয়ে এবং জকিগঞ্জের বিশাল ভোটব্যাংক নিজের বাক্সে নিতে মরিয়া। অন্যদিকে কানাইঘাটের দুই প্রার্থী—উবায়দুল্লাহ ফারুক ও চাকসু মামুনের মধ্যে ভোট ভাগাভাগি হলে তার সুফল সরাসরি মুফতি আবুল হাসানের বাক্সে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জোটের অস্বস্তি ‘বিদ্রোহী’ মামুন : সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ দীর্ঘদিন ধরেই এই আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করায় তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। স্থানীয় ভোটারদের মতে, বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা শাস্তির ভয়ে প্রকাশ্যে মামুনের সাথে না থাকলেও, পর্দার আড়ালে তাদের একটি বড় অংশ এবং তরুণ ভোটাররা মামুনের দিকেই ঝুঁকছেন। অনেকে মনে করছেন, অতীতে জোট প্রার্থীদের এমপি বানিয়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ায় সাধারণ ভোটাররা এবার বিকল্প নেতৃত্বের খোঁজ করছেন। জমিয়তের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে বিএনপি এবার কোনো প্রার্থী না দিয়ে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে সমর্থন দিয়েছে। এতে বাদ পড়েছেন বিএনপির দীর্ঘদিনের কাণ্ডারি মামুনুর রশীদ। ২০১৮ সাল থেকে দলের সবুজ সংকেতের আশায় থাকা মামুন শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। যদিও স্থানীয় বিএনপি নেতারা শাস্তির ভয়ে প্রকাশ্যে মামুনের সাথে নেই, কিন্তু সাধারণ কর্মী ও নিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে তার প্রতি এক ধরণের সহমর্মিতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ঘরানার ভোট যদি মামুনের বাক্সে যায়, তবে জোট প্রার্থী উবায়দুল্লাহ ফারুকের জন্য জয়ের পথ কঠিন হয়ে পড়বে।
সুবিধাজনক অবস্থানে মুফতি আবুল হাসান? ভোটের মাঠের বর্তমান চিত্র বলছে, উবায়দুল্লাহ ফারুক ও চাকসু মামুনের মধ্যে ভোট ভাগাভাগি হলে তার সুফল পেতে পারেন মুফতি আবুল হাসান। বিশেষ করে জামায়াতের সংরক্ষিত ভোটব্যাংকের পাশাপাশি জকিগঞ্জের বিশাল এলাকা এবং আওয়ামী লীগ ঘরানার একটি নীরব অংশের সমর্থন তার দিকে ঝুঁকে পড়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী যেভাবে জকিগঞ্জের ভোট নিজের দিকে টেনে এমপি হয়েছিলেন, সেই একই কৌশলে এবার এগোচ্ছেন মুফতি আবুল হাসান। জামায়াত সমর্থিত এই প্রার্থী অত্যন্ত সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী নিয়ে মাঠে রয়েছেন। জকিগঞ্জের আঞ্চলিক ভোট এবং নিজস্ব আদর্শিক ভোটারদের ওপর ভর করে তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে জকিগঞ্জ থেকে বরাবরই এমপি নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস তাকে বাড়তি শক্তি জোগাচ্ছে। সিলেটের এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে, তা জানতে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট যুদ্ধে নির্ধারিত হবে জকিগঞ্জ-কানাইঘাটের আগামীর নেতৃত্ব। মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের জোটের শক্তি, মুফতি আবুল হাসানের সাংগঠনিক ভিত্তি, নাকি চাকসু মামুনের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ জয়ী হয়, তা দেখতে মুখিয়ে আছে সিলেটের রাজনৈতিক মহল
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল হালিম সাগর সম্পাদকীয় কার্যালয় : ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা) টিকাটুলি ঢাকা ১২০৩। ফোন : 01722-062274, 01715-496849, ই- মেইল halimshagor2000@gmail.com Banglasangbad1@gmail.com dainikbanglasangbadbd@gmail.com সিলেট অফিস :-৪০৬ রংমহল টাওয়ার,(৪র্থ তলা) বন্দর বাজার সিলেট ৩১০০। ফোন : 01972-062274। Canada office : 35 bexhilAve Scarborogh. Toranto. canada.
Design & Development By HosterCube Ltd.