
আব্দুল মুনিব কানাডা থেকে : ইরান-ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি, ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং ইরান ও রাশিয়ার তেলের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল অস্থির হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক দেশ জ্বালানিতে ভর্তুকি, রেশনিং এবং সাশ্রয়ী ব্যবহারের পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘদিন জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির কারণে জনগণের দুর্ভোগ বেড়েছে। বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন উৎপাদনে ২০০০ মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকার বিভিন্ন জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কথাও শোনা যাচ্ছে।
১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর ওপেকভুক্ত দেশগুলো তেল রপ্তানি বন্ধ করলে জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র পরে শতাধিক পারমাণবিক চুল্লি পর্যন্ত নির্মাণ করে। এরপর বিভিন্ন দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। বর্তমান ইরান-ইসরাইল এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও পারমাণবিক শক্তির গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে মনে হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা বিশ্বজুড়ে ধীরে ধীরে কমছে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির উন্নয়ন দ্রুত বিকাশ ঘটছে। ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামভিত্তিক ফিশন প্রযুক্তির পাশাপাশি ভবিষ্যতে ডিউটেরিয়ামভিত্তিক ফিউশন প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকেও ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে। বর্তমানে উন্নত নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ আধুনিক পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের পাশাপাশি ছোট আকারের মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) এবং আরও ক্ষুদ্র ক্ষমতার মাইক্রো-রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। ছোট আকারের রিঅ্যাক্টর সাধারণত ৩০০ মেগাওয়াট বা তার কম ক্ষমতার হয়, আর মাইক্রো-রিঅ্যাক্টর সাধারণত ১ থেকে ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার হয়ে থাকে। এ ধরনের রিঅ্যাক্টর কারখানায় মডিউলার পদ্ধতিতে তৈরি করে দ্রুত স্থাপন করা যায়। এগুলো শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়, সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন, সমুদ্রের লোনা পানি বিশুদ্ধকরণ এবং শিল্পকারখানায় তাপ সরবরাহের ক্ষেত্রেও ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করছে। কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকল্প হিসাবেও এগুলোকে দেখা হচ্ছে। সাবমেরিনে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহে ছোট রিঅ্যাক্টরের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। এছাড়া দূরবর্তী দ্বীপাঞ্চল, খনি এলাকা, সামরিক ঘাঁটি, গবেষণা কেন্দ্র এবং বড় ডেটা সেন্টারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যও এগুলো সম্ভাবনাময় উৎস। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশ এ প্রযুক্তি উন্নয়নে এগিয়ে রয়েছে। জার্মানি ও ইতালিও আধুনিক পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের পথে হাঁটছে। মেটা, গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানিও তাদের ডেটা সেন্টারের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক প্রযুক্তিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বর্তমান দেশের জ্বালানি সংকটকালে রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এখানে রয়েছে ১২০০ মেগাওয়াট (ইলেকট্রিক) বা ৩২০০ মেগাওয়াট তাপীয় ক্ষমতাসম্পন্ন রাশিয়ার তৈরি ৩+ প্রজন্মের দুটি আধুনিক ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর। সম্প্রতি ১৬ এপ্রিল রিয়্যাক্টর-১-এর যন্ত্রপাতি স্থাপন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনসহ পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানিকে পরিচালনা করার জন্য লাইসেন্স দিয়েছে। ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশ, রাশিয়া এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রিঅ্যাক্টর-১-এ পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। এটি দেশের জন্য একটি বড় প্রযুক্তিগত মাইলফলক। রিঅ্যাক্টরে ৩-৫ শতাংশ ইউরেনিয়াম-২৩৫সমৃদ্ধ জ্বালানি স্থাপন বা ফুয়েল লোডিং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এর মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর-১ নির্মাণপর্ব থেকে কমিশনিং পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এরপর থেকে সব কার্যক্রমই হবে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর পরিচালনার কার্যক্রম। ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হতে এক থেকে দেড় মাস লাগতে পারে। এরপর রিঅ্যাক্টর কোরে নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়া শুরু করার আগে কন্ট্রোল রড, জরুরি শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা আবারও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হবে। সব পরীক্ষা সফল হলে রিঅ্যাক্টরটির মোট ৩২০০ মেগাওয়াট তাপীয় ক্ষমতার মাত্র ১ শতাংশ সক্ষমতায় প্রথম নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়া সংঘটিত হবে। এটিকে বলা হয় রিঅ্যাক্টর ক্রিটিক্যালিটি টেস্ট। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর প্রথমবার ‘প্রাণ’ পাবে। কম শক্তিতে এ পরীক্ষা করার কারণ হলো, কোনো ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়। এরপর রিঅ্যাক্টরের উৎপন্ন তাপ দিয়ে স্টিম জেনারেটরের মাধ্যমে বাষ্প তৈরি হবে। সেই বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ করবে। ধাপে ধাপে ৫, ১০, ১৫, ৩০ শতাংশসহ বিভিন্ন ইলেকট্রিক সক্ষমতায় রিয়্যাক্টর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। দীর্ঘ সময় এ পরীক্ষার মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা যাচাই করা হয়। এ প্রক্রিয়াকেই কমিশনিং বলা হয়। পুরো কমিশনিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে এক বছর সময় লাগতে পারে। এরপর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সব নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানিকে পরিচালনা করার জন্য লাইসেন্স প্রদান করবে। সেই দিনটি হবে বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
একবার বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকলে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে। এজন্য একে বেইজলোড প্ল্যান্ট বলা হয়। প্রায় ১৮ মাস পরপর প্রতিটি ইউনিটে প্রায় ২৫ টন ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম জ্বালানি বের করে সেই পরিমাণ নতুন জ্বালানি স্থাপন করতে হয়। এ সময় দেড় থেকে দুই মাস রিঅ্যাক্টর বন্ধ রাখা হয়। এরপর আবার প্রায় ১৮ মাস নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন চলে। এভাবে প্রতিটি রিঅ্যাক্টর প্রায় ৬০ বছর পরিচালনা করা সম্ভব। একদিনও এ কেন্দ্র বন্ধ থাকলে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ তেল, এলএনজি বা কয়লা দিয়ে উৎপাদন করতে গেলে ব্যয় অনেক হয়। এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো রিঅ্যাক্টর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে কঠোরভাবে নিরাপত্তা সংস্কৃতি অনুসরণ করা। একই সঙ্গে বৈদেশিক নির্ভরতা কমাতে এবং জাতীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি সফলভাবে দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
Leave a Reply