
আব্দুল মুনিব কানাডা থেকে : বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর পয়লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়। বাংলাদেশেও দিনটি ঘিরে নানামুখী আয়োজন থাকে। তবে, এবারের প্রেক্ষাপটে সংশোধিত শ্রম আইন নিয়ে শ্রমিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন কাঠামো, শ্রমিকের সংজ্ঞা এবং ভবিষ্য তহবিল (প্রভিডেন্ট ফান্ড) ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হলেও বাস্তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। শ্রমিক নেতাদের অনেকের মতে, আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুর্বল। ফলে শ্রমিকরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, সংগঠিত খাতের বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনও কার্যকর শ্রম সুরক্ষার আওতার বাইরে, আর অনানুষ্ঠানিক খাতে এই পরিস্থিতি আরও জটিল। তথ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটি কারখানায় সর্বোচ্চ পাঁচটি ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ রাখা হয়েছিল, যা বর্তমানে কমিয়ে তিনটিতে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকের সংজ্ঞায় পরিবর্তনের পাশাপাশি ভবিষ্য তহবিল ব্যবস্থায় মালিকদের জটিলতা কমানো হয়েছে। গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল’ পাস হয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের স্বাক্ষরের পর এটি আইনে পরিণত হবে। সংশোধিত শ্রম আইনে মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি, উৎসব ছুটি বাড়ানো এবং ভবিষ্য তহবিল বাধ্যতামূলক করার মতো ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও এর কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে সংশয় রয়েছে। শ্রমিক নেতাদের মতে, শক্তিশালী তদারকি ও স্বচ্ছ প্রয়োগ কাঠামোর অভাবে আইনি এই পরিবর্তনগুলো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে, ফলে শ্রমিকরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করেছিল বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আইন সংশোধনের বিষয়টি চুড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয় একই বছরের ২৩ অক্টোবর। সংশোধিত কাঠামোতে ‘মহিলা’ শব্দের পরিবর্তে ‘নারী’ শব্দ প্রতিস্থাপন, ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, তিন বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠন, ১০০ জন শ্রমিক থাকলে ভবিষ্য তহবিল বাধ্যতামূলক করা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন করার মতো পরিবর্তন আনা হয়। একই সঙ্গে বার্ষিক উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৩ দিন করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বিলে এই বিধানগুলো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন কাঠামোতেও পরিবর্তন এনে একটি প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানপুঞ্জে সর্বোচ্চ তিনটি ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আগে পাঁচটি পর্যন্ত ছিল। পাশাপাশি শ্রমিকের সংজ্ঞা থেকে ‘কর্মচারী’ ও ‘কর্মকর্তা’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ভবিষ্য তহবিল বিষয়ে নতুন বিধানে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ১০০ জন স্থায়ী শ্রমিক থাকলে বাধ্যতামূলকভাবে তহবিল গঠন করতে হবে। তবে, দুই-তৃতীয়াংশ কর্মী জাতীয় পেনশন স্কিম ‘প্রগতি’-তে যুক্ত হওয়ার আবেদন করলে প্রতিষ্ঠান ভবিষ্য তহবিল গঠন থেকে অব্যাহতি পাবে। উভয় ক্ষেত্রেই চাঁদা ৫০ শতাংশ করে মালিক ও শ্রমিক বহন করবেন। নতুন শ্রম আইন (সংশোধন) তেমন কোনো উপকারে আসবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির হোসেন হাওলাদার। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস সম্পর্কে অনেক শ্রমিকই সচেতন নন। তারা জানেন না এই দিনে ছুটি পাবেন কি না। এছাড়া, আইনে যতই ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার দেওয়া হোক, বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই; কারণ মালিকপক্ষের একটি অংশ ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে অনাগ্রহী।’ সংশোধিত আইনে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা কারখানাপ্রতি সর্বোচ্চ পাঁচটি থেকে কমিয়ে তিনটিতে আনা হয়েছে। শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেছেন যে, প্রায় সব কারখানাতেই মালিকানাধীন ‘পকেট ইউনিয়ন’ থাকায় সংখ্যার এই পরিবর্তনে বিশেষ পার্থক্য হবে না। এছাড়া, দেশের প্রায় সাত কোটি শ্রমিকের ৯৯ শতাংশই কোনো সংগঠনের আওতার বাইরে থাকায় তাদের দাবি আদায় কঠিন হয়ে পড়েছে কবির হোসেন আরও বলেন, “তিনটি ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ দেওয়া বা না দেওয়ার মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই, কারণ প্রায় সব কারখানাতেই মালিকানাধীন ট্রেড ইউনিয়ন বা ‘পকেট ইউনিয়ন’ রয়েছে। এছাড়া, শ্রমিকের সংজ্ঞা পরিবর্তন করলে স্বল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত অনেক শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন, যা বেকারত্ব বাড়াতে পারে।” তবে, ভবিষ্য তহবিল কাঠামো বাস্তবায়ন করা গেলে তা শ্রমিকদের জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক শ ম জামাল উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, শ্রমিকদের অধিকার আইনে আছে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। আইনে যা আছে, তা মানলেও পরিস্থিতি অনেক ভালো হতো; কারণ ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক প্রতিষ্ঠানই শ্রম আইন মানে না, এমনকি কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানও তা অনুসরণ করে না। শ্রমিকদের বিশাল অংশই কোনো সংগঠন বা কাঠামোর আওতায় নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশে সরকারি-বেসরকারি হিসাবে প্রায় সাত কোটির বেশি শ্রমিক রয়েছেন, যার মধ্যে এক শতাংশও কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন। অর্থাৎ ৯৯ শতাংশ শ্রমিকই সংগঠনের বাইরে। যেখানে সংগঠন রয়েছে, সেখানে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান হয়; কিন্তু যেখানে নেই, সেখানে কিছুই করার থাকে না।’ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস সম্পর্কে অনেক শ্রমিকই সচেতন নন। তারা জানেন না এই দিনে ছুটি পাবেন কি না। এছাড়া, আইনে যতই ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার দেওয়া হোক, বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই; কারণ মালিকপক্ষের একটি অংশ ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে অনাগ্রহী । অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না— জানতে চাইলে এই নেতা বলেন, ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে শ্রমিকদের সরাসরি আইনের আওতায় আনার দাবি দীর্ঘদিনের। তবে, সংগঠনের বাইরে থাকায় এসব দাবি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক নেতারাও মালিকপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ করেন তিনি, যা বাস্তবায়নকে আরও দুর্বল করে। শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম খান নাসিম বলেন, শ্রমিকদের দাবিদাওয়া কখনওই পুরোপুরি পূরণ হয় না। জীবনযাত্রার ব্যয় অনুযায়ী মজুরি বাড়াতে হয়, কিন্তু মালিকপক্ষ সহজে তা দিতে চায় না; তাই আন্দোলনের মাধ্যমেই তা আদায় করতে হয়। সংশোধিত শ্রম আইন নিয়ে তিনি বলেন, এবারের সংশোধনীতে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও বাস্তবায়নে নানা বাধা রয়েছে, কারণ নানা কৌশলে এসব বাস্তবায়ন ঝুলে থাকে। এছাড়া, অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কোনো অধিকারই আদায় করা যায়নি। অর্থাৎ ন্যূনতম মজুরি কত হবে, তা এখনও নির্ধারণ করা যায়নি। সেজন্য তাদের সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে। তবে, নতুন ভবিষ্য তহবিল কাঠামো আগের তুলনায় উন্নত হলেও কিছু জটিলতা রয়েছে। এবারের শ্রমিক দিবসে শ্রমিকদের দাবিগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।
শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, শক্তিশালী তদারকি ও স্বচ্ছ প্রয়োগ কাঠামো প্রয়োজন। নয়তো আইনি পরিবর্তন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। তাই আইন সংশোধনের পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় এ প্রসঙ্গে আইনজীবী মনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী বলেন, শ্রম আইন (সংশোধন) করা হলেও এর কার্যকর প্রয়োগই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আইনের কিছু পরিবর্তন ইতিবাচক হলেও অংশীজনদের যথাযথ অংশগ্রহণ ছাড়া নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন পর্যায়ে জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়ন ও ভবিষ্য তহবিল ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা মাঠপর্যায়ে শ্রমিক-মালিক সম্পর্কে নতুন ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, শক্তিশালী তদারকি ও স্বচ্ছ প্রয়োগ কাঠামো প্রয়োজন। নয়তো আইনি পরিবর্তন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। তাই আইন সংশোধনের পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
Leave a Reply