
বিশেষ প্রতিবেদন:আট মাস ধরে ময়মনসিংহের সিভিল সার্জনের পদটি শূন্য রয়েছে। ফলে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন দিয়ে জেলার কার্যক্রম চলছে। এতে জেলার স্বাস্থ্যখাতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। অনিয়ম, দুর্নীত ছাড়াও গ্রুপিং চলছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মচারীরা। জানা যায়, গত বছরের অক্টোবরে ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডা. ছাইফুল ইসলাম খানকে বদলি করা হয়। এরপর ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. ফয়সাল আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন করা হয়। ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন অফিসের কয়েকজন কর্মচারী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত কর্মচারীরা জানান, ডা. ফয়সাল আহমেদ ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর থেকে ঢালাও বদলি শুরু করেন। কর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ না থাকলেও হয়রানিমূলকভাবে এ আট মাসে অন্তত ৩২ জন কর্মচারীকে বদলি করেছেন। বদলি ছাড়াও এ আট মাসে অন্তত ৫ জন কর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত করা হয়েছে। তবে তদন্তে কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পায়নি তদন্ত কমিটি। অভিযোগ রয়েছে, ক্যাশিয়ার ইমরান মেহেদী হাসান তার বিরুদ্ধাচরণ করা কর্মীদের বিরুদ্ধে সাজানো অভিযোগ তুলে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনকে দিয়ে তদন্ত করান। এ নিয়ে ইমরানের ওপর অন্য অনেক কর্মচারীর ক্ষোভ রয়েছে। সিভিল সার্জনের পিএ মো. সুলতান উদ্দিন বলেন, সম্প্রতি আমার বিরুদ্ধে ইমরানের সাজানো দু’টি অভিযোগে তদন্ত হয়েছে। একটিতে আমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছি। অপরটির প্রতিবেদন এখনো জানা যায়নি। জানা যায়, ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের নৈকট্য পাওয়ার প্রতিযোগিতাকে ঘিরে সিভিল সার্জন অফিসের কর্মীদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে এ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছেন ক্যাশিয়ার ইমরান। এতে অন্য অনেক কর্মচারী ক্ষুব্ধ। তাদের অভিযোগ দুর্নীতির দায়ে এর আগে শাস্তিমূলক বদলি ও প্রতারণা মামলায় জেল খাটা ইমরান সিভিল সার্জনকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে আবার ময়মনসিংহে যোগদান করেন। এমন অভিযোগে সম্প্রতি ময়মনসিংহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার চোখে পড়ে। তবে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ও ইমরান ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিভিল সার্জনের পিএ সুলতানের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সুলতান একটি ক্লিনিকে বসে একজনের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। ভিডিও প্রচারকারীর দাবি সুলতান ক্লিনিক থেকে সিভিল সার্জনের নাম করে অবৈধভাবে টাকা নিচ্ছেন। এ ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সুলতান দাবি করেন, ক্যাশিয়ার ইমরান ষড়যন্ত্র করে মিথ্যা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছেন। ময়মনসিংহের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জানান, আট মাস ধরে সিভিল সার্জন না থাকার কারণে কর্মচারীরা এমন কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়েছেন। মূলত ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের নৈকট্য পেয়ে অবৈধ ক্ষমতা চর্চার জন্য কর্মচারীরা ব্যস্ত। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে সিভিল সার্জন হচ্ছেন প্রধান অভিভাবক। অথচ ময়মনসিংহের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় দীর্ঘদিন ধরে সে অভিভাবক নেই। আমাদের দাবি দ্রুত সিভিল সার্জন নিয়োগ দেয়া এবং কাদা ছোড়াছুড়ি করা কর্মচারীদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত করা। সিভিল সার্জনের অফিসের একাধিক কর্মচারী জানান, ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন বিতর্কিত ক্যাশিয়ার ইমরানকে সব কাজে প্রাধান্য দিচ্ছেন। ইমরান এর আগে ২০২২ সালের জুলাই মাসে দুর্নীতির অভিযোগে ময়মনসিংহ থেকে মাগুরা জেলায় বদলি হন। বদলির পর আবারো ময়মনসিংহে ফেরার জন্য প্রতারণার আশ্রয় নিলে র্যাবের হাতে আটক হয়ে এক মাস কারাগারে ছিলেন। ২০২৫ সালের আগস্টে ইমরান স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন অফিসে নিজের বদলির আদেশ করান। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আদেশ পেয়ে তৎকালীন সিভিল সার্জন ছাইফুল ইসলাম খান ইমরানকে যোগদান করতে দেননি মামলার কারণে। এক মাস পারে ছাইফুল ইসলামকে ময়মনসিংহ থেকে বদলি করা হয়। এরপর ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পান ডেপুটি সিভিল সার্জন ফয়সাল আহমেদ। তিনি দায়িত্ব পাওয়ার দিনই ইমরানকে যোগদান করানো হয়। কর্মচারীদের অভিযোগ, সম্প্রতি ইমরান একটি মারামারি ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি হয়েছেন। আসামি হওয়ার পর গত ২৮শে এপ্রিল থেকে ১২ই মে পর্যন্ত ইমরান কোনো প্রকার ছুটি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত।ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম ইমরানের নামে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলার বিষয়ে ইমরানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনকে অবহিত করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফয়সাল আহমেদ বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। এটা আমার ব্যক্তিগত কোনো বিষয় না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চাইলে আমি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবো। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, ময়মনসিংহের সিভিল সার্জনের পদটি অনেকদিন ধরেই শূন্য আছে। শূন্যপদে নতুন সিভিল সার্জন নিয়োগ দিতে আমি ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি।
Leave a Reply