
সম্পাদকীয় : গত ২০২৫ সালে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল আশাব্যঞ্জক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রবাসী আয়ে ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে দেশ এক নতুন ইতিহাস গড়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় রেমিট্যান্সের পরিমাণ প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে একটি শক্তিশালী ভিত প্রদান করেছে। বিশেষ করে বছরের শেষ মাস অর্থাৎ ডিসেম্বরে ৩২৩ কোটি ডলারের সমাগম এবং মার্চের রেকর্ড ভাঙা আহরণ প্রমাণ করে, প্রতিকূলতার মাঝেও প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে মরিয়া।
বলা বাহুল্য, দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলতেই হবে, হুন্ডি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বয়, ব্যাংকিং চ্যানেলে সেবার সহজীকরণ এবং সরকারি প্রণোদনা এই রেকর্ড সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে মনে রাখা দরকার, এ প্রাপ্তির পেছনে লুকিয়ে আছে লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনি এবং প্রিয়জনদের ছেড়ে বিদেশের মাটিতে একাকী সংগ্রামের গল্প। অর্থনীতির এই বীর যোদ্ধারা রাষ্ট্রকে দুহাত ভরে দিলেও বিনিময়ে তারা কতটা পাচ্ছেন-সেটি আজ বড় প্রশ্ন।
প্রবাসী শ্রমিকদের এই অভাবনীয় অবদানের বিপরীতে তাদের প্রাপ্য নাগরিক সুবিধা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বিষয়টিতে দেশ এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। বিদেশের মাটিতে অনেক শ্রমিকই আইনি জটিলতা, কর্মস্থলে বৈষম্য ও ন্যূনতম চিকিৎসাসেবার অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করেন। অধিকন্তু, নিজ দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে তাদের যে ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার হতে হয়, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। যে প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করছেন, তাদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য বিমা, সর্বজনীন পেনশন স্কিম এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় কার্যকর ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা তাই এখন সময়ের দাবি। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারণা ও হয়রানি বন্ধে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কম খরচে সরাসরি কর্মী পাঠানোর দিকেও নজর দিতে হবে। এ লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে ভিসা যাচাই এবং খরচের তালিকা উন্মুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে বিদেশে কর্মস্থলে আইনি ও কূটনৈতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা বৃদ্ধি করাও দরকার। দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে নজর দিতে হবে দেশের জেলা পর্যায়ে ভাষা শিক্ষাসহ আধুনিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার দিকেও। আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের উচিত প্রবাসীদের কল্যাণে কেবল মৌখিক প্রশংসা না করে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করা। প্রতিটি দূতাবাসে আইনি সহায়তা সেল শক্তিশালী করাই শুধু নয়, দেশে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক ব্যবহারে কার্যকর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে প্রয়োজন প্রবাসী কল্যাণ বন্ড কিংবা বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ সহজ করা এবং মুনাফার হার আকর্ষণীয় রাখা। বিদেশ ফেরত প্রবাসীরা যাতে দেশে কোনো ব্যবসা বা শিল্প গড়ে তুলতে পারেন, সেজন্য জামানতবিহীন ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করাও যেতে পারে। এছাড়া বিমানবন্দরে তাদের সম্মানজনক সেবা প্রদান নিশ্চিত করাও সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। বস্তুত রেমিট্যান্সের এই রেকর্ড প্রবাহ ধরে রাখতে হলে প্রবাসীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। প্রবাসীদের জীবনমান উন্নয়ন এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।
Leave a Reply