
সম্পাদকীয় : রাস্তায় জ্যামে পড়লে গাড়িতে বসে বাদাম খাওয়া আমার পুরোনো অভ্যাস। সেদিন একইভাবে জ্যামে আটকে বাদামওয়ালা দেখে ইশারায় কাছে ডাকলে দেখি তাঁর প্রতি প্যাকেট বাদাম আগের মতো কাগজের ঠোঙার পরিবর্তে ছোট ছোট পলি ব্যাগে সাজানো এবং তা দেখে বাদাম কিনা বাদ দিয়ে তাঁর দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। মনে মনে ভাবলাম দেশ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কোনো ভাবনা-চিন্তা আছে বলে মনে হয় না। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে একজন পরিবেশসচেতন ব্যক্তি থাকার পরও পলিথিনের ব্যবহার শনৈ শনৈ বাড়ছে, যা সত্যিই দুর্ভাবনার বিষয়। পলিথিন নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও তা বাস্তবায়ন সেভাবে হচ্ছে না। কাঁচাবাজার থেকে আধুনিক শপিংমল–সব জায়গায়ই পলিথিনের রাজত্ব চলছে। একটা কাপড় লন্ড্রি থেকে নিলে কিংবা আধা কেজি সবজি কিনলে দুটো করে পলিথিন ব্যাগ পাওয়া যায়, কারণ নিয়ন্ত্রণহীন পলিথিন উৎপাদনে খরচ সামান্য। অথচ এই অপচ্য পলিথিনের আয়ুষ্কাল নাকি কাছিমের মতো ৫০০ বছর। কিছুদিন আগে খবরে দেখলাম কর্ণফুলী নদীর তলদেশ ড্রেজিং করা যাচ্ছে না। কারণ নদীর তলদেশে দুই থেকে সাত মিটার পর্যন্ত পলিথিনের স্তর পড়ে যাওয়ায় অত্যাধুনিক ড্রেজিং মেশিনও কাজ করছে না। পলিথিনের কারণেই যে দেশের ছোট-বড় সব নদীর এই মরণদশা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পলিথিন ব্যাগের সঙ্গে রয়েছে চিপসের মোড়ক, নানা রকমের প্লাস্টিকের বোতল, রয়েছে ই-বর্জ্য। অথচ যত্রতত্র পলিথিন কেনাবেচা নিষিদ্ধ। পলিথিনের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। এটি অপচনশীল হওয়ায় শত শত বছর থেকে যায়, মাটির উর্বরা শক্তি কমিয়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করে, নদী ও খালে জমে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে, জলজ প্রাণী ধ্বংস করে, পোড়ালে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে মানুষের শ্বাসতন্ত্রের ভয়াবহ ক্ষতি করে, পশু-পাখি পলিথিন খেয়ে মারা যায় বা অসুস্থ হয় এবং মানুষের খাবারের সঙ্গে মিশে গিয়ে ক্যান্সারসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, ফলে জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।আমাদের দেশীয় এক বিজ্ঞানী পাট থেকে পলিথিন আবিষ্কার করে প্রশংসিত হয়েছেন, যা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে বাজারে ছাড়ার জোর দাবি উঠলেও অজানা কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব। ছোট্ট একটি দেশ মানুষের ভারে নুয়ে পড়েছে এবং ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে দিনে সৃষ্টি হচ্ছে হাজার হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য। এক ঢাকা শহরে নাকি এ বর্জ্যের পরিমাণ দিনে ১২শ টন। পলিথিন বন্ধ করা প্রসঙ্গে মাঝেমধ্যে শুনি, এটি বন্ধ হলে নাকি কর্মসংস্থানের ওপর আঘাত আসবে। এ খাতে কত লোক কাজ করে তার পরিসংখ্যান আমরা জানি না। তদুপরি পলিথিন ব্যাগের কাঁচামালের জোগান আসে বিদেশ থেকে। এ জন্য ব্যয় হয় কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা।পলিথিনের ক্ষতি কমাতে এর ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে আনা, বাজারে কাপড়, জুট বা কাগজের ব্যাগ ব্যবহার করা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা, জনসচেতনতা বাড়ানো, স্কুল-কলেজে পরিবেশবান্ধব শিক্ষা দেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো; যাতে মানুষ পলিথিনের ক্ষতি বুঝে বিকল্প ব্যবহার করতে উৎসাহিত হয়। কাগজ এবং পাটের থলে ব্যবহার করলে গ্রাম ও শহরে অনেক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দেশও নিঃশ্বাস নিতে পারবে। তাই অন্তত পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করুন এবং অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে পুনর্ব্যবহারকে উৎসাহিত করুন, দেশ বাঁচান।
Leave a Reply