
বিশেষ প্রতিনিধি : এক সময় সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলা ছিলো চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য। বিগত আওয়ামী লীগে আমলের দীর্ঘ ১৭ বছর সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদকে ঘিরে গড়ে উঠে বিভিন্ন সিন্ডিকেট। বিশেষ করে জামাই সুমন, সুভাস, সামছুল আলম, বিশ্বনাথি ফজলু, ছাতকী আলাইসহ প্রায় ৫০ জনের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রন করতো জাফলং পাথর কোয়ারী থেকে শুরু করে বিশাল সীমান্তের চোরাচালান। সীমান্তের সেই চোরাই পথকে চোরাকারবারিরা ঘাট হিসাবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। পুলিশ বিজিবি আর সাবেক মন্ত্রীর প্রত্যক্ষ মদদে চলতো উৎসবের মতো বালু-পাথরলুট আর চোরাচালান।
বিগত ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পঠ পরিবর্তন হলে বদল হয়নি চাঁদাবাজী আর চোরাকারবারিদের নিয়মনীতির কিছুই। শুধুমাত্র হয়েছে চাঁদাবাজাদের চেহারা আর হাতের পরিবর্তন। যদি এখন বেড়েছে চাদাঁবাজি আর চোরাচালানের মাত্রা। গত কয়েক মাস থেকে স্থানীয় থানার ওসি মনিরুল ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে দেশে নিয়ে আসা হচ্ছে হাজার হাজার গরু-মহিষ। ওসির হয়ে নাকি সব দেখাশুনা করেন গোলাম হোসেন নামের জনৈক ব্যক্তি। গত ১২ ফেব্রুয়ারী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাবেক সিটি কপোরেশনের একাধিক বারের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। নির্বাচনের আগেই তিনি আশ্বাসদেন লাখো বেকারের কর্মসংস্থানের জন্য সনাতন পদ্ধতিতে জাফলং কোয়ারী এলাকা থেকে পাথর উত্তোলন করতে যে মন্ত্রনালয়ে যাওয়া প্রয়োজন হবে তিনি সেখানেই যাবেন। এবং তিনি সেখানকার মানুষের কষ্ট লাগবে কাজ করবেন। তার এই বক্তব্য শুনে সেখানকার শত-শত ব্যবসায়ী ও হাজার-হাজার শ্রমিকরা আশার আলো দেখতে শুরু করেন। নিজের ভাগ্যগুণে একাধিক মন্ত্রনালয়ের পাশাপাশি তিনি শ্রম ও কর্মস্থান মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এক রকম ভাগ্য খোলে বসে যায় লাখো বেকার শ্রমিক আর শত শত ব্যবসায়ীর, যদি এবার বন্ধ কোয়ারী খোলে দেওয়া হয় তাহলে লাখো শ্রমিক আবারও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। কিন্তু তিনি মন্ত্রী হয়ে শপথ নিয়ে সিলেট পৌছাঁর আগেই গোয়াইনঘাট উপজেলায় কয়েকটি গ্রুপ বিভিন্ন ভাবে বিভক্ত হয়ে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপকর্মে। অথচ আরিফুল হক চৌধুরী ব্যক্তিগত ভাবে এসব সিন্ডিকেটের কাউকেই চিনেন না। তিনিও চান পাথর কোয়ারী খোলে দিতে। যাতে সীমান্তের চোরাকারবার আর বেকারত্ব দূর হয় এলাকার জনসাধারণের।
গোয়াইনঘাটের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বিছনাকান্দি উপজেলার অন্যতম বৃহৎ চোরাচালান করিডোর। এখানে প্রতিদিন চলে শতকোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য। অনুসন্ধানে দেখা গেছে এ সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে শুধু গরু-মহিষ নয়, পশুর আড়ালে সীমান্ত হয়ে আসছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক। আর এই পুরো সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে সীমান্তের অঘোষিত সম্রাট বিছনাকান্দি ইউনিয়নের উপর গ্রামের ‘বুঙ্গাড়ী’ গোলাম হোসেন। তবে আরিফুল হক চৌধুরীকে এসব চোরাকারবারি বিষয়ে একটি সতর্ক থাকবে হবে। কারণ এরা সুবিদাবাদী চোরাকারবারি। যখন যে দখল ক্ষমতায় তখন তারা সে দলের লোক। তিনি বলতে শুরু করেছেন তিনি আরিফুল হক চৌধুরীর কাছের লোক। তাই ওসির হয়ে তিনি আগেও লাইনের টাকা তুলছেন এবারও তুলবেন, তাতে কোন অসুবিধা হবে। অথচ গতকালই ওসি সকল বিট অফিসারকে ডেকে বলছেন সর্তক ভাবে দায়িত্বপালন করতে। তাহলে যে গোলাম হোসেন নিজেকে ওসির লাইনম্যান পরিচয় দিচ্ছে দীর্ঘ দিন থেকে তার বিরুদ্ধে কেন আইনতো ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলছেন না থানার ওসি মনিরুল ইসলাম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, থানার ওসির নাম ভাঙ্গিয়ে বিছনাকান্দি ও হাদারপাড় এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন গোলাম হোসেন ওরফে ‘বুঙ্গাড়ী গোলাম হোসেন’। স্থানীয়দের ভাষায়, তিনি এখন এই অঞ্চলের ‘চাঁদাবাজির মহারাজ’। স্থানীয় ভাবে গোলাম হোসেন প্রভাবশালী হওয়ার কারণে তিনি তাঁর কয়েকজন সহযোগী আব্দুল খালিক, হেলাল উদ্দীন, জালাল উদ্দিন মেম্বার, সেবুল আহমদ, এম.এ.খালিক, ফরিদুল ইসলাম ও ফারুক আহমদসহ কিছু লোক নিয়ে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী একটি চোরাচালান সিন্ডিকেট। যেটি ভাংতে পারছেন না ওসি নিজেই। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনআমলে ছিলো সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলয়ের লোকজন। সরকারের পঠ পরিবর্তন হওয়ার সাথে এরা সকলেই হয়ে গেছে সরকার দলীয় বিএনপির কর্মী। কিন্তু স্থানীয়দের কাছে এরা চোরাকারবারি হিসাবেই পরিচিত।
সূত্র জানা যায়, ভারত থেকে আসা প্রতিটি গরু ও মহিষ থেকে দুই হাজার টাকা হারে চাঁদা আদায় করে গোলাম হোসেন ও তার বাহিনী। এর আগে গোলাম হোসেন সহজ স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছিলেন, আমরা স্থানীয় বিজিবি ও গোয়াইনঘাট থানার ওসিকে, পুলিশের বিট অফিসারদের ম্যানেজ করে ভারতীয় গরু-মহিষের চোরাচালান ব্যবসা করে যাচ্ছি। আমরা মূলতো পাথর কোয়ারী ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলাম। পাথর কোয়ারী বন্ধ থাকায় এখন পুলিশ ও বিজিবিকে ম্যানেজ করে ভারত থেকে চোরাই পথে গরু নিয়ে আসি। প্রতিটি গরু থেকে আমরা পুলিশ, বিজিবিকে নির্ধারিত একটি টাকা দেই। এছাড়া কিছু সাংবাদিকদেরও আমরা ম্যানেজ করে ব্যবসা করছি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত রয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, একজন ইউপি চেয়ারম্যান ও এক কথিত সাংবাদিক নেতা। তাদের প্রভাবের কারণে প্রতিদিন প্রকাশ্যে হাজারো চোরাই গরু উপজেলার তোয়াকুল ও হাদারপার বাজারে নিয়ে আসা হয়। যে সব গরু এই বাজারে বিক্রি করা না যায় সেগুলোর জন্য হাদারপার থেকে তোয়াকুল গরুর বাজারের রশিদ দিয়ে সিলেটের দেশের বিভিন্ন বাজারে বিভিন্ন জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তোয়াকুল বাজার ইজারা নিয়েছেন স্থানীয় বিতর্কীত এক চেয়ারম্যান, তিনিই বাজারের রশিদের মাধ্যমে আদায় করে বিপুল অংকের টাকা। উপজেলার সীমান্ত দিয়ে আসা গরু হাদারপার বাজারে ও পিরেরবাজার ও তোয়াকুল বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে প্রতিটি গরুর জন্য দুই হাজার টাকা চাঁদা নিয়ে রশিদ দেওয়া হয়। এভাবেই চোরাই গরুকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে বৈধতা। এখানে শুধু ভারতীয় চোরাই গরু-ই নয়, দেশীয় চুরি হওয়া গরুকেও রশিদ দিয়ে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে বলে নাম প্রকাশে অনেকে এ প্রতিবেদককে জানান। হাদারপার বাজারে চোরাই গরু ব্যবসার নেতৃত্ব দিচ্ছে, হেলাল উদ্দীন, গোলাম হোসেন, জালাল মেম্বার ও সেবুল। আর পিরেরবাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আব্দুল খালিক, ফরিদুল ইসলামসহ আরেক দল।
নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই গোলাম হোসেনের মাধ্যমে সীমান্ত দিয়ে শুধু পশুই নয়, আসছে ইয়াবা, ফেনসিডিল এবং ছোট আগ্নেয়াস্ত্র। বিনিময়ে দেশ থেকে পাচার হচ্ছে স্বর্ণ ও হুন্ডির কোটি কোটি টাকা। গোলাম হোসেন নিজেই দম্ভের সাথে স্বীকার করেছেন তার সম্পৃক্ততার কথা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তার অবস্থান টলেনি তাদের। রাজনৈতিক খোলস পাল্টানো ‘লাইনম্যান’ বিছনাকান্দির বখাইয়া গ্রামের সীমান্ত পয়েন্টটি নিয়ন্ত্রণ করেন ফয়েজ আহমদ। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘বিজিবি’র লাইনম্যান’ হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগ আমলে তিনি ছিলেন যুবলীগ নেতা। সরকার পতনের পর রাতারাতি ‘যুবদল’ নেতা পরিচয় দিয়ে নিজের আধিপত্ব্য বজায় রেখেছেন। ভারত থেকে আসা জিরার বিশাল চালানগুলো ফয়েজ আহমদের তদারকিতেই দেশে প্রবেশ করে। পরে জালাল মেম্বার অবৈধকে বৈধ করার ‘কারখানা’ দায়িত্ব পালন করেন। চোরাই পণ্যগুলো যখন সীমান্ত পার হয়ে বাজারে পৌঁছায়, তখন সেগুলোকে ‘বৈধ’ করার দায়িত্ব পালন করেন বিছনাকান্দি ইউনিয়নের মেম্বার ও হাদারপাড় বাজারের ইজারাদার জালাল আহমদ। ভারত থেকে আসা পশুর জন্য তিনি বাজারের ভুয়া রশিদ বা ‘সিট’ প্রদান করেন। এই কাগজের মাধ্যমেই চোরাই গরুগুলো ট্রাকযোগে নির্বিঘ্নে পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বিগত কয়েক মাস আগে বিজিবি’র হাতে ধরা পড়া ২৩৭টি গরুর চালান সিলেট সীমান্তের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, জাফলং ও কোম্পানীগঞ্জ প্রশাসনের কড়াকড়ি বেড়ে যাওয়ায় চোরাকারবারিরা বিছনাকান্দির এই দুর্গম পথকে ‘সেফ রুট’ হিসেবে বেছে নিয়েছে। থানা থেকে অনেক দূরে হওয়ায় এবং যাতায়াত ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুবিধা নিচ্ছে এই সিন্ডিকেট।
প্রশাসনের ভূমিকা: অনুসন্ধানে পুলিশের সাথে গোলাম হোসেনের গভীর সখ্যতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, নির্দিষ্ট টাকা বা ‘এন্ট্রি ফি’ না দিলে পুলিশি অভিযান চালানো হয়, আর টাকা দিলে সব ‘ওপেন’। তবে গোয়াইনঘাট থানার ওসি জানিয়েছেন, তারা মাদক ও চোরাচালান বিরোধী অভিযানে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। স্থানীয়দের মতে জালাল, কয়েস ও গোলাম হোসেনের এই সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে বিছনাকান্দির এই ‘চোরাই রাজ্য’ বন্ধ করা সম্ভব নয়। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় ভারতীয় চোরাচালানের মূলহোতা এই গোলাম হোসেন সিন্ডিকেট।
চাঁদাবাজির পদ্ধতি: ভারত থেকে চোরাই পথে আসা প্রতিটি গরু-মহিষ বাজারের রশিদে সরকারি নির্ধারিত ফি ৫০০ টাকা লেখা হলেও বাস্তবে আদায় করা হচ্ছে ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা। পাশাপাশি, রাস্তায় পুলিশি ঝামেলা এড়ানোর নাম করে গাড়ি প্রতিটি গাড়ি থেকে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের লাইনের টাকা হিসাবে। এই টাকা থেকে বিজিবি ও পুলিশকে দেওয়ার পর বড় একটি অংশ সিন্ডিকেটভুক্ত নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভাগ হয়ে থাকে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, প্রতিদিন শুধু বিছনাকান্দি সীমান্ত দিয়েই প্রায় হাজারের উপরে গরু ঢুকছে। অপর দিকে হাজিপুর প্রতাপুর সীমান্ত দিয়ে আসছে আরো হাজারো গরু-মহিষ। কিন্তু বিজিবির তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। যদিও পদস্থ কর্মকর্তারা চোরাচালান বন্ধে চেষ্টা করেন, তবে অধস্তন পর্যায়ের কিছু সদস্য চক্রের সঙ্গে আঁতাত করে লাইনম্যান নিয়োগ দিয়ে এই ব্যবসা চালাচ্ছেন। তার পরেও বিজিবির চাপে পড়ে দু-একটি গরু মহিষের চালান আটক করছে। তা আবার নিজস্ব কিছু সাংবাদিক ডেকে ফলাও করে প্রকাশও করে। এ বিষয়ে গোলাম হোসেনের বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলে তিনি কল রিসিভ না করায় তার নতুন কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনার সিলেট জানিয়েছে, ভারত বৈধভাবে বাংলাদেশে গরু রপ্তানি করে না। তবু প্রতিবছর সীমান্ত দিয়ে বিপুল সংখ্যক গরু প্রবেশ করছে, যা মূলত চোরাচালান সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে।
সরেজমিন গেলে জানা যায়, গোলাম হোসেনের ইতিহাস, তিনিসহ কারা এসব চোরাচালানের সাথে জড়িত কি ভাবে ভারত থেকে গরু আসে এসব নিয়ে আমাদের এবারের বিস্তারিত প্রতিবেদন করতে গেলে একাধিক ফোন আসতে থাকে এ প্রতিবেদকের কাছে। চোরাকারবারি গোলাম হোসেনের নাকি রয়েছে একটি শক্তিশালী সাংঘাতিক সিন্ডিকেট। যারা সাংবাদিকতার আড়ালে গোলাম হোসেনের কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে বখরা নিয়ে থাকেন। বিনিময়ে গোলাম হোসেনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করতে গেলে বিভিন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে সাংবাদিকদের ম্যানেজ করে থাকেন। যেনো গোলাম হোসেনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ হলে তাদের সাপ্তাহিক বখরা ও রুটি রুজি বন্ধ হয়ে যায়। আসছে গোলাম হোসেনের শেল্টারদাতাসহ পুলিশ কানেকশনের আদ্যপ্রান্ত।
Leave a Reply