
নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট : সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং সীমান্ত এখন চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। উর্ধ্বতন প্রশাসনের বারবার নির্দেশ সত্ত্বেও থামছে না ভারতীয় পণ্যের অবৈধ অনুপ্রবেশ। অভিযোগ উঠেছে, জাফলং বিট অফিসের ইনচার্জ এসআই আব্দুল হান্নান এবং কনস্টেবল হামিদের প্রত্যক্ষ মদদ ও ‘লাইনম্যান’ সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই চলছে এই কোটি কোটি টাকার চোরাচালান বাণিজ্য।
সিন্ডিকেটের নেপথ্যে যারা: স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৩নং পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের নলজুরি পুলিশ ফাঁড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল বখরা বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক। অভিযোগ রয়েছে, বিট অফিসার এসআই আব্দুল হান্নান ও থানার বিভিন্ন কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিন লাখ টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে। এই টাকা উত্তোলনের মূল দায়িত্ব পালন করছেন কনস্টেবল হামিদ। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মোটরসাইকেল নিয়ে তিনি বের হন ‘লাইনের’ টাকা সংগ্রহ করতে। গভীর রাত পর্যন্ত সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে ঘুরে ঘুরে চোরাকারবারিদের কাছ থেকে বখরা নিশ্চিত করেন তিনি। এমনকি স্থানীয় কিছু অসাধু চক্রকে ম্যানেজ করার দায়িত্বও তার কাঁধে বলে জানা গেছে।
চোরাচালানের রুট ও পণ্যের তালিকা: অনুসন্ধানে দেখা যায়, নলজুরি, তামাবিল স্থলবন্দর, আমতলা, আমসপ্ন, সোনাটিলা, সংগ্রামপুঞ্জি, লালমাটি, সাইনবোর্ড, ক্যাম্প ক্যান্টিন, জিরো পয়েন্ট এবং সিড়িঘাট পয়েন্ট দিয়ে অবাধে আসছে ভারতীয় পণ্য। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে: ভারতীয় চিনি ও চা-পাতা। উচ্চমূল্যের কসমেটিকস ও মদের কার্টন। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন। ভারতীয় কিট ও অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রী। ব্যবসায়ীদের দাবি, পুলিশ নির্ধারিত ‘লাইনম্যান’কে টাকা দিলে মালামাল নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। টাকা না দিলে চলে আটকের নাটক ও মামলার ভয়।
শ্রমিকদের হাহাকার বনাম পুলিশের বিলাসিতা: উপজেলা প্রশাসনের কড়াকড়িতে জাফলংয়ে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় লাখো শ্রমিক এখন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ অভিযোগ রয়েছে, রাতের অন্ধকারে পুলিশকে ম্যানেজ করে এখনো কিছু অসাধু চক্র পাথর উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ শ্রমিকরা কর্মহীন থাকলেও পুলিশ ও লাইনম্যানদের পকেট ভারী হচ্ছে ঠিকই। স্থানীয়রা জানান, জেলায় এসপি এবং থানায় ওসির পরিবর্তন হলেও এসআই আব্দুল হান্নানের মতো কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন একই স্থানে বহাল তবিয়তে থেকে নিজেদের আধিপত্ব্য বজায় রাখছেন।
জনপ্রতিনিধির প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান অবস্থা: এলাকার বেকার শ্রমিকদের দাবি, নির্বাচনের সময় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী সনাতন পদ্ধতিতে পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই আশার দিকে তাকিয়ে হাজারো পরিবার দিন গুনছে। কিন্তু কোয়ারি বন্ধের সুযোগে সীমান্ত বাণিজ্যের রমরমা অবস্থা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
এ বিষয়ে জাফলং বিট অফিসার এসআই আব্দুল হান্নানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি “ব্যস্ত আছি” বলে ফোন কেটে দেন।
সিলেটের নবাগত পুলিশ সুপার জানান, “আমি এখানে নতুন যোগ দিয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হবে। চোরাচালান বা অনৈতিক কাজের সাথে কোনো পুলিশ সদস্যের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।”
অন্যদিকে, সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি মুশফেকুর রহমান বলেন, “প্রতিটি মিটিংয়েই চোরাচালান বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। জাফলং সীমান্তের অভিযোগটি তদন্ত করে দেখা হবে এবং সত্যতা পেলে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
Leave a Reply