
আব্দুল মুনিব কানাডা থেকে : বাজারে ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে সবজি, মাছ, মাংসসহ প্রায় সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এর প্রভাব পড়ছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ডলারের দাম, জাহাজ ভাড়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে আমদানি পণ্যে। দ্রব্যমূল্য বাড়লেও ভোক্তার আয় বাড়েনি। সরকারপ্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে নিম্নবিত্ত এ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের কিছুটা মানিয়ে নিতে পারলেও মধ্যবিত্ত সহজে পারে না। মধ্যবিত্তের ট্র্যাজেডি হলো, তারা না পারে নিম্নবিত্তের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির পণ্য সংগ্রহ করতে, না পারে উচ্চবিত্তের মতো বাড়তি দামের বোঝা অনায়াসে সইতে। লোকলজ্জার ভয়ে তারা মুখ ফুটে অভাবের কথা বলতে পারে না, আবার আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিজের প্রয়োজনকে কাটছাঁট করতে হয়। টিকে থাকার জন্য অনেককে সঞ্চয় ভেঙে অথবা ঋণ করে চলতে হয়। একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে দেশটির জনগণ কতটা স্বস্তিতে জীবনযাপন করছে, তার ওপর। মধ্যবিত্তকে কঠিন চাপের মুখে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রশ্ন হলো, পণ্যের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণ কি কেবলই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ? বাস্তবতা হলো, দেশের বাজারব্যবস্থা আগে থেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব অনেক বেশি ও অযৌক্তিক। অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পকেট কাটে সাধারণ মানুষের। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাজার তদারকির কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রভাব অতি সামান্য। মাঝেমধ্যে কিছু জরিমানা বা অভিযান চালানো হলেও সিন্ডিকেটের মূল হোতারা সব সময়ই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। মধ্যবিত্ত তথা জনগণকে স্বস্তি দিতে হলে সবার আগে দরকার বাজারের এই অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দূর করা। আমরা মনে করি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেবল মৌসুমি তদারকি যথেষ্ট নয়। যে কোনো পরিস্থিতিতে বাজারে কার্যকর ব্যবস্থাপনা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। পুরো সরবরাহ চেইনকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, মজুতদার ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সত্যিকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশে পণ্যের চাহিদা ও মজুতের সঠিক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সুযোগ তৈরি না হয়। তৃতীয়ত, পণ্যবাহী ট্রাকে পথে পথে চাঁদাবাজি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এটি কঠোর হাতে দমন করতে হবে। চতুর্থত, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহের বিশেষ কার্ড বা রেশনব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। জনগণের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা জনমনে কেবল ক্ষোভেরই জন্ম দেবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে তা জাতীয় অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সব শ্রেণির মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার বিষয়টি সরকার যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে, এটাই কাম্য।
Leave a Reply