
স্টাফ রির্পোটার: সিলেট ৪ (কোম্পানীগঞ্জ-গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর) আসনে ১১ দলীয় জোটের হয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে লড়ছেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. জয়নাল আবেদীন। এই আসনে নির্বাচন করার উদ্দেশ্যে ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই প্রচারণায় নামেন তিনি। দীর্ঘদিন একাই তিন উপজেলার মাঠ-ঘাট চষে বেড়িয়েছেন। সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক করেছেন। দিনরাত শ্রম দিয়ে প্রান্তিক মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছেন। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের দেরিতে প্রার্থী নির্বাচন, অভ্যন্তরিণ দ্বন্দ্ব-গ্রুপিং আসনটিতে তার সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলে। জামায়াত সমর্থিত লোকজন জোর গলায় বলতে থাকেন সিলেট-৪ এ তারাই জিতবেন। সেই জয়নাল আবেদীনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ ঐক্যবদ্ধ বিএনপি। এই আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক দুইবারের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর পক্ষে স্থানীয় বিএনপি গ্রুপিং দ্বন্দ্ব ভুলে একতাবদ্ধ হয়ে মাঠে নেমেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটের সীমান্তবর্তী এই জনপদে বিএনপির অভ্যন্তরিণ দ্বন্দ্ব এবং গৃহবিবাদ দীর্ঘদিনের। বিএনপির ভোট ব্যাংক-খ্যাত আসনটিতে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের দুইবারের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম চৌধুরী, প্রয়াত এমপি দিলদার হোসেন সেলিমের পত্নী অ্যাডভোকেট জেবুন নাহার সেলিম, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা হেলাল উদ্দিন আহমেদ, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম। তবে শেষ পর্যন্ত দলের মনোনয়ন পান সিসিকের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এরপর থেকে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। মনোনয়ন বঞ্চিতরা একে একে আরিফুল হকের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেন। এরমধ্যেই দলের সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তোষ জানিয়ে মশাল মিছিল করেন মনোনয়ন বঞ্চিত আব্দুল হাকিম চৌধুরী ও হেলাল উদ্দিন। তারা হাইকমান্ডের কাছে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেন। তবে হাইকমান্ড আরিফেই আস্থা রাখেন। পরে এ দুজনের বাসায় ছুটে যান আরিফ। দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে একই মোহনায় মিলিত হন তারা। প্রথমে হেলাল উদ্দিন এবং পরে আব্দুল হাকিম চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে আরিফকে সমর্থন দেন। বিভেদের দেয়াল ভেঙে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ হন বিএনপির নেতাকর্মীরাও। এদিকে, বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থীদের মাঠে রাখতে তৎপর হয়ে ওঠেন জয়নাল আবেদীনের কর্মী-সমর্থকরা। আরিফুল হককে ‘বহিরাগত’ বলে আওয়াজ তুলেন তারা। তাদের ধারণা ছিলো— স্থানীয়-বহিরাগত প্রশ্নে বিএনপিকে বিভক্ত রাখা গেলে বা একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলে এর সুফল পাবে জামায়াত। কিন্তু, সবকিছু ছাপিয়ে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হককে স্বাগত জানায় তিন উপজেলার বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী। আরিফ ঘোষণা দেন, নির্বাচিত হলে সিলেট – ৪ আসনের অন্তর্গত তিনটি উপজেলাকে শহরে রূপান্তর করবেন। দেশ-বিদেশের মানুষ শাহজালাল (রহ.) এর মাটিতে পা রেখেই যেন জৈন্তা, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ দেখতে আসে। খনিজ সম্পদে ভরপুর তিনটি উপজেলাকে সেভাবেই সাজাবেন। এর বাইরে পাথর কোয়ারিকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের বিষয়টিও সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন৷ এদিকে, বিএনপি এবং সাধারণ ভোটারদের বৃহৎ একটি অংশের মতে, আরিফুল হক চৌধুরীকে প্রার্থী হিসেবে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। তিনি দুইবারের নন্দিত মেয়র ছিলেন। তার হাত ধরে সিলেটে ব্যাপক উন্নয়নসাধিত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন বঞ্চিত সিলেট-৪ আসনে কাঙ্খিত উন্নয়ন সাধিত হবে। পাথর কোয়ারি নিয়ে মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট, সকল অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা ঘুচবে। তাদের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ‘লোকাল’ নাকি ‘বহিরাগত’ সেটা তেমন ম্যাটার করেনা। দল এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজন এখানে ম্যাটার করে। প্রয়াত অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম -সাইফুর রহমান এবং সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী এখান থেকে এমপি হয়েছিলেন। তাদের সময়ে এই অঞ্চলে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। তারা কেউই ‘লোকাল’ না হলেও সবাই ছিলেন সিলেটী। আরিফ সাহেবও সিলেটী। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল মন্নান বলেন, ধানের শীষের পক্ষে বিএনপি পরিবার ঐক্যবদ্ধ। উন্নয়নের স্বার্থে মানুষ আরিফ সাহেবকে ভোট দেবে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীসহ ভোটারদের অপর একটি অংশ মনে করেন, জয়নাল আবেদীন বিগত ১৭ মাস ধরে প্রচারণা করছেন। সেবামূলক কাজ করেছেন। এই আসনের মানুষের সাথে তার একটা হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে। তাছাড়া জয়নাল আবেদীন ‘লোকাল’ হওয়ায় ভোটে তাকেই চাইবে মানুষ।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা ফয়জুর রহমান বলেন, জয়নাল আবেদীন দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে মাঠে আছেন৷ সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে ছিলেন। সেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন এবং তিনি লোকাল। তার বিপরীতে যে-ই প্রার্থী হোক আমরা জনগণের ওপর আস্থাশীল। আগামী নির্বাচনে জয়নাল বিপুল ভোটে জয়ী হবেন। এদিকে বিএনপির সঙ্গে আরিফের পক্ষে যেমন জমিয়তসহ অন্যান্যরা ঐক্যবদ্ধ, তেমনি জয়নালের পেছনেও ঐক্যবদ্ধ জামায়াতের নেতৃত্বে থাকা ১১ দলীয় জোট। এই ঐক্য শেষ পর্যন্ত যারা ধরে রাখতে পারবেন, শেষ হাসিটা তারাই হাসবেন বলে ধারণা স্থানীয় ভোটারদের। উল্লেখ্য, সিলেট ৪ আসনে মোট ভোটার ৫ লক্ষ ১২ হাজার ৯৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লক্ষ ৭৬ হাজার ২৩১ জন। নারী ভোটার ২ লক্ষ ৪৫ হাজার ৮০২ জন।
Leave a Reply