
নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ সরোওয়ার আলমকে নিয়ে বিতর্ক যেন থামছেই না। ১০ কোটি টাকার মনোনয়ন বৈধতার ঘুষের অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ‘নির্বাচনী পাসকার্ড’ ইস্যু নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তিনি। নির্দিষ্ট কয়েকটি সাংবাদিক সংগঠনকে সুবিধা দেওয়া এবং অধিকাংশ সংবাদকর্মীকে বাদ দিয়ে বৈষম্য তৈরির অভিযোগে স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। সারাদেশে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের জন্য নির্বাচনী পাসকার্ড প্রদান করা হলেও শুধু মাত্র সিলেট জেলা প্রশাসক রির্টানিং অফিসার ভানুমতির খেলা শুরু করেছেন। তিনি সিলেটে সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতেই বিভিন্ন ভাবে কোটকৌশল অবলম্বন করছেন বলে সিলেটের বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা আজ ডিসি অফিসের সামনেই এ প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেন।
সিলেট ডিসি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় সাংবাদিকদের নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহ করতে তাদের নামে ইস্যুকৃত পাস কার্ড বিতরণ করা কথা গত ৯ ফেব্রুয়ারি বেলা ২ঘটিকায়র সময়। এরকম একটি সাইনবোর্ড ডিসির দরজায় ঝুলানো রয়েছে। পরদিন ডিসি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, ৯ তারিখের নোটিশটি খোলে ফেলে পরদিন ১০ ফেব্রুয়ারী সাংবাদিকদের পার্সকার্ড বিতরণের সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়েছে। আজ বিকালে ডিসি অফিস গিয়ে দেখা যায় ডিসির দরজায় নোটিশ লাগানো হয়েছে আগামী ১১ তারিখ দুপুর ১১টা থেকে সাংবাদিকদের পাস কার্ড ও পর্যবেক্ষণ কার্ড ও গাড়ির পাস দেওয়া হবে। অথচ ১০ তারিখ রাত ১২ টা থেকে গাড়ি চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের অনুমতি ছাড়া কোন যানবাহন চলাচল করতে পারবেনা, নির্ধারিত কিছু কারণ ব্যতীত। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করবেন কি করে সাংবাদিকরা এ প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় জেলা প্রশাসক সিলেটের কাছে। এদিকে উপজেলার সদরে থাকা সাংবাদিকরা কার্ড পাবেন ১১ তারিখ দুপুর ১১টায়। কিন্তু যেখানে যানবাহন থাকবেনা বা বিধি নিষেধ রয়েছে তারা জেলা শহর থেকে কি ভাবে এসে কার্ড সংগ্রহ করবেন।
তালিকা থেকে বাদ একাধিক সংগঠন : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত সময়ে বিভাগীয় কমিশনার বা সাবেক জেলা প্রশাসকরা সিলেটের সকল সাংবাদিক সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করলেও বর্তমান ডিসি যোগদানের পর থেকেই বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ একটি গোষ্টি সমর্থিত এক বিতর্কিত সম্পাদকের পরামর্শে সিলেটের একাধিক সক্রিয় সাংবাদিক সংগঠনকে সরকারি তালিকা থেকে বাদ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন তিনি। তালিকায় শুধুমাত্র সিলেট প্রেসক্লাব, জেলা প্রেসক্লাব, ইমজা এবং অনলাইন প্রেসক্লাবকে রাখা হয়েছে। অথচ সিলেটের বর্তমান বিভাগীয় কমিশনারের দাওয়াত পত্রে ‘সিলেট সিটি প্রেসক্লাব’সহ অন্যান্য সংগঠনের সরব উপস্থিতি দেখা যায়।
সাবেক ডিসির প্রথাভঙ্গ : সাবেক ডিসি শের মাহমুদ মুরাদের নিয়ম ভেঙে বর্তমান ডিসির এমন একপেশে সিদ্ধান্তে সিলেটের সিংহভাগ সাংবাদিক বিভিন্ন রকম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ডিসির সাথে দেখা করতে গেলে তার মনোস্ফুত সাংবাদিক ছাড়া কাউকে পাত্তাই দেন না তিনি। সাংবাদিকরা ঘন্টার পর ঘন্টা বাহি
কার্ড নিয়ে সিন্ডিকেট কেন? সিলেটের সাংবাদিক মহলে এখন মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে যে, জেলা প্রশাসক অফিসের সব রকম কার্যক্রম এখন ‘কুদরত উল্লাহ মার্কেট’ কেন্দ্রিক একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, ওই মার্কেটের জণৈক ব্যক্তির ইশারা ছাড়া ডিসি বাহিরে পা ফেলার সাহস পান না। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছর যারা সরকারি সকল রকম সুযোগ সুবিধাভোগী ছিলেন, তারাই এখন নতুন মোড়কে ডিসির ঘনিষ্ঠ হয়ে এসব কলকাঠি নাড়ছেন বলে দাবি করছেন বঞ্চিত সাংবাদিকরা। তবে বিষয়টি বিষয়ে অনুসন্ধান কালে জানা যায়, স্থানীয় বিএনপি প্রন্তি সাংবাদিকদের কোনঠাশা করতে এমন খেলা চলছে।
পাসকার্ড নিয়ে ‘ভানুমতির খেলা কেন? নির্বাচনী পাসকার্ড ইস্যু নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে সিলেট জেলা প্রশাসনে চলছে নানা নাটকীয়তা। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহার স্বাক্ষরিত এক পত্রে নির্দিষ্ট মাদ্র ৪টি ক্লাবের নাম উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ আছে, শুরুতে তালিকায় সিলেট সিটি প্রেসক্লাবসহ আরো কিছু সংগঠনের নাম থাকলেও ওই বিশেষ সম্পাদকের চাপে সেই নামগুলো তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। যারা ডিসি অফিসসহ সরকারি সব কয়টি দপ্তরকে তাদের মতো করে জিম্মী করে রাখতে চায় তারাই এসব বিষয়ে কলকাঠি নাড়ছেন।
স্থানীয় সাংবাদিকরা যা বললেন : বিষয়টি নিয়ে মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সিলেটের নেতা সাংবাদিক নুরুল ইসলামসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ডিসির সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি জানান, কোনো প্রেসক্লাব ভিত্তিক পাসকার্ড ইস্যু করা হবে না, কার্ড হবে প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক, পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল কর্তৃক। কিন্তু রহস্যজনকভাবে পরের দিনই তিনি সেই নির্দিষ্ট ৪টি ক্লাবের তালিকা গ্রহণ করেন, যা সাধারণ সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। ডিসি তালিকা থেকে কৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে, সিলেট সিটি প্রেসক্লাবের নাম, ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন নাম, মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সিলেট, সিলেটে বিভাগীয় প্রেসক্লাবের নাম, সাংবাদিক ইউনিয়নের নাম। সিলেটের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জন্য পর্যবেক্ষণ পাস কার্ড বিতরণের সময়সূচি তিনবার পরিবর্তন করায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। হঠাৎ হঠাৎ সময় পরিবর্তনের ঘটনায় সাংবাদিকদের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে উপস্থিত হলেও কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে আবার নতুন সময় জানানো হলেও সেটিও অল্প সময়ের ব্যবধানে সংশোধন করা হয়। এভাবে একই দিনে তিন দফা সময় পরিবর্তনের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাংবাদিকরা পড়েন চরম বিড়ম্বনায়। সাংবাদিকদের অভিযোগ, একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পাস কার্ড বিতরণের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এমন অগোছালো সিদ্ধান্ত প্রশাসনের দায়িত্বহীনতারই প্রমাণ। অনেক সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব ফেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাননি। এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ সাংবাদিকরা বলেন, সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়টি যদি আগে থেকেই স্পষ্টভাবে জানানো হতো, তাহলে এই ভোগান্তি এড়ানো যেত। তারা দ্রুত প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের দাবি জানান। যদিও এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলার কার্ড এবার জেলা শহরে, নজিরবিহীন ভোগান্তি : দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকরা সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় থেকেই সংবাদ সংগ্রহের পাসকার্ড সংগ্রহ করতেন। কিন্তু এবার বর্তমান ডিসি সেই নিয়ম ভেঙে সকল উপজেলার কার্ড জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ইস্যু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে সিলেটের বিভিন্ন প্রান্তিক উপজেলা থেকে সাংবাদিকদের হাড়ভাঙা খাটুনি আর অর্থ ব্যয় করে সিলেটে আসতে হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের বারান্দায় জটলা বেঁধে কয়েকশ উপজেলা সাংবাদিককে পাসকার্ডের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা জানান, “পেশাগত দায়িত্ব পালনের অনুমতি নিতে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে জেলা শহরে এসে এভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চরম অবমাননাকর। এর আগে কখনো এমন নজিরবিহীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি।” তবে ১১ তারিখ পাসকার্ড ইস্যু হবে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে সুস্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষোভের সাথে লিখেন ১২ তারিখ নির্বাচনের পরে যেনো সাংবাদিকদের পাস ইস্যু করা হয়। এর আগে দিনভর একটি নোটিশে দেখা যায়, ভোট সেন্টারের ৪ মিটারের ভিতরে কোন সাংবাদিক মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। যদিও পরে বিকালের দিকে প্রত্যাহার করে নির্বাচন কমিশন।
চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা: এর আগে সিলেট-২ আসনের এক প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধতা দেওয়া নিয়ে ১০ কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠলে ডিসি সংবাদ সম্মেলন করে তা নাকচ করেন। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, “১০ হাজার কোটি টাকা দিয়েও তাকে কেনা যাবে না।” তবে বর্তমান কর্মকাণ্ডে সাংবাদিকরা প্রশ্ন তুলছেন মুখে সততার বুলি আওড়ালেও কাজে কেন এই বৈষম্য? তিনি কি জনস্বার্থে কাজ করছেন নাকি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করছেন?
বক্তব্য পাওয়া যায়নি ডিসি : এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা প্রশাসক ও জেলা রির্টানিং কর্মকর্তা সরোওয়ার আলমকে বারবার ফোনে ওয়োসআপে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাই উনার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিলেটে সাংবাদিকদের মাঝে তৈরি হওয়া এই বৈষম্য নিরসনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় সংবাদকর্মীরা।
Leave a Reply