
স্টাফ রির্পোটার: সবার উপরে সিলেট। মানে দেশ সেরা আমাদের এই প্রিয় নগরী। বাংলাদেশের ৮টি মহানগরীর মধ্যে নিরাপত্তা ও কম অপরাধপ্রবণ নগরীর তালিকায় সবার উপরেই আছে বলে জানিয়েছেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল কুদ্দুছ পিপিএম। সম্প্রতি সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারের সম্মেলণ কক্ষে অনুষ্ঠিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনাকে ছিনতাই হিসেবে মিডিয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে করে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। তালতলা এবং তেমুখি ঘটনা দুটিকে যাচাই করে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে মারামারির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।‘একদিনে তিন ছিনতাই, আতঙ্কে নগরবাসী’, ‘সিলেট এখন ছিনতাইয়ের নগরী’- এ ধরনের কিছু সংবাদ দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এসএমপি ইতোমধ্যে ফেসবুক পেইজে একটা বিবৃতি প্রকাশ করেছে। পুলিশ কমিশনার বলেন, সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিভিন্ন পত্রিকায় যেভাবে লেখা হয়েছে বাস্তবে সেটার চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় আমরা আছি। এটা পরিসংখ্যান দিয়ে আপনাদেরকে দেখানো হয়েছে। এখন একটা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটার পরে যদি এরকম কথা আসে যে সিলেট এখন ছিনতাইয়ের নগরীতে পরিণত হয়েছে- এটা আমাদেরকে বিব্রত করে। এবং আমাদের মোরালটাকে নষ্ট করে। এই বিষয়টাও আমার মনে হয় আপনাদেরকে একটু খেয়াল করতে হবে। ৫আগস্টের পরে যে ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে পুলিশ দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, পুলিশ বাহিনীকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আমরা যে নিরলস পরিশ্রম করে গেছি- আপনাদের সক্রিয় সহযোগিতা ও পজেটিভলি নিউজ করা, আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থে- জনস্বার্থে পুলিশকে উৎসাহিত করা এটা আমরা প্রত্যাশা করি- যোগ করেন পুলিশ কমিশনার। তিনি আরও বলেন, আমাদের মধ্যে ভিন্নতা হতে পারে। চিন্তা এবং পেশাগত কারণে একই জিনিসকে বোঝাপড়ার ভিন্নতা হতে পারে- কিন্তু মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় যেভাবে নিউজ প্রকাশ হয়েছি- আমরা একটু বিব্রত হয়েছি। আপনাদের যেকোনো মতামত আমরা গ্রহণ করব। জনগণের ইচ্ছায় আমি কাজ করব, জনগণের মধ্যে আপনারা একটা মেজর স্টেকহোল্ডার। ভুলবোঝাবুঝি যেন আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি না করে, সে বিষয়ে আমি আপনাদের সাথে দৃষ্টি আকর্ষণ করব। প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, শহরগুলোর নিরাপত্তা ও অপরাধ ইনডেক্স নিয়ে কাজ করে এমন একটি আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট নাম ঘটগইঊঙ.পড়স অপরাধ ইনডেক্সে দেশের সবচেয়ে কম অপরাধপ্রবণ নগরীর তালিকায় আছে সিলেট মহানগরী। আর এ কারণেই সবচেয়ে নিরাপদ নগরীর তালিকায়ও সবার উপরে অবস্থান সিলেটের।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সোমবার এ ওয়েসাইটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সিলেট মহানগরীর অপরাধ প্রবণতার মাত্রা ছিল দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম, মাত্র ৩২ দশমিক ৭০ ভাগ। এর পরের অবস্থানে থাকা রংপুর মহানগীর চেয়েও তা প্রায় ১৬ শতাশ কম। ওইদিন রংপুরের অপরাধ প্রবণতার মাত্রা ছিল ৪৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এই ওয়েবসাইটের হিসাব অনুযায়ী দেশের সবচেয়ে বেশী অপরাধপ্রবণ নগরীর হচ্ছে গাজীপুর, ৭১ দশমিক ৫১ শতাংশ। এরচেয়ে কম অপরাধ প্রবণ হচ্ছে যথাক্রমে চট্টগ্রাম (৬৪ দশমিক ২০ শতাংশ), খুলনা (৬২ দশমিক ৫০ শতাংশ), ঢাকা (৬২ দশমিক ৪২ শতাংশ), বরিশাল (৫৩ দশমিক ০৬ শতাংশ) ও রাজশাহী (৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ)। একই ওয়েবসাইটের সেফটি ইনডেক্স বা নিরাপত্তা সূচকেও দেশের অন্যসব নগরীর উপরে অবস্থান করছিল সিলেট (৬৭ দশমিক ২০)। এরপরের অবস্থান ছিল যথাক্রমে রংপুর (৫৪ দশমিক ৪১), রাজশাহী (৫১ দশমিক ৩২), বরিশাল (৪৬ দশমিক ৩২), ঢাকা (৩৭ দশমিক ৫৮), খুলনা (৩৭ দশমিক ৫০) চট্টগ্রাম (৩৫ দশমিক ৮০) ও গাজীপুর (২৮ দশমিক ৪৯)। এসময় তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক মানদন্ডে কোনো নগরীর নিরাপত্তা সূচক ৬০ এর উপরে থাকলে সেটিকে বিশ্বব্যাপী নিরাপদ নগরী হিসাবে গণ্য করা হয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত সেপ্টেম্বরে যখন তিনি সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন এই সূচকে সিলেটের অবস্থান ছিল ৫৩ বা ৫৪ পয়েন্টের মতো যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সূচক অনুযায়ী অনিরাপদ নগর ছিল। সেখান থেকে আমাদের এই উন্নতি হয়েছে সবার আন্তরিক সহযোগীতা ও তৎপরতায়। কিন্তু ইদানিং কিছু ফেসবুক পেজ ও কিছু গণমাধ্যমে সিলেটকে অনিরাপদ নগর বলে নানান ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে যা মোটেও সঠিক বা সত্য নয়। তিনি বলেন, ৪ এপ্রিল নগরীর তালতলা ও তেমুখির দুটি ব্যক্তিগত মারামারির ঘটনাকে ছিনতাই বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছে এবং এরপরই সিলেটের আইশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অপপ্রচার জোরালো হয়। তিনি এ ধরনের সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে সবাইকে আরও সতর্ক হয়ে যাচা-বাছাই এবং প্রয়োজনে পুলিশের বক্তব্য নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানান, গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সিলেট মহানগর এলাকা থেকে মোট ২ হাজার ৬৬৭ জন অপরাধীকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছিল যার মধ্যে ডাকাত ১৯, ছিনতাইকারী ৪৮ ও চোরের সংখ্যা ছিল ৯৫ জন । আর গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মোট ৩ হাজার ৪৩ জনকে যাদের মধ্যে ডাকাত ২০, ছিনতাইকারী ১০৩ ও চোর ১০৪ জন। তিনি অপপ্রচারে কান না দিয়ে পুলিশকে সহেযাগীতা করতে সাংবাদিক সমাজসহ সচেতন সিলেটবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। শহরকে ফুটপাত ও যানজট মুক্ত করণে আপনাদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে অগ্রণী। প্রতিনিয়ত আপনারা এগুলোকে হাইলাইট করে নিউজ করেছেন। জনমত তৈরি হয়েছে। আমাদের কর্মকর্তারা অন্তত এটা নিয়ে গর্ব করতে পারি যে, বাংলাদেশের কোন জায়গায় অবৈধ গাড়ি রাস্তা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়নি যেটা আমরা করেছি। বাংলাদেশের কোন জায়গা থেকে ফুটপাত থেকে অবৈধ হকারদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। এই কার্যক্রমকে টেকসই করার জন্য আমাদের নিয়মিত অভিযান চলমান আছে- জানান তিনি। ২৬৩ জন ছিনতাইকারীর একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে জানিয়ে বলেন, চিহ্নিত ছিনতাইকারীদের আমরা পর্যায়ক্রমে ধরব। তালিকাভুক্তদের মধ্য থেকে ইতোমধ্যে ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ছিনতাই প্রতিরোধে বিশেষায়িত কয়েকটা দল গঠন করা হয়েছে। তাদের কাজই হচ্ছে ছিনতাইকারীকে ধরা। আগামী দুই-একমাসের মধ্যে দের অপতৎপরতা বন্ধ করতে সমর্থ হব। পুলিশ কমিশনার বলেন, লো এন্ড অর্ডারের ক্ষেত্রে অপরাধকে শূন্যের মাত্রায় নামিয়ে আনা একটা ইউটোপিয়ান চিন্তাভাবনা, এটা আসলেই করা সম্ভব না। অপরাধ একদমই থাকবে না, এটা বাস্তবিক ও আক্ষরিক অর্থে সম্ভব না। কিন্তু এটাকে একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে যদি আনা যায়, সহ্য সীমার মাত্রা যদি আনা যায় তখন সেটাকে নিরাপদ শহর হিসেবে অনুভব করতে পারি। যদি এখানকার নিরাপত্তাটাকে ভাল রাখা যায়, পর্যটক আসতে আরো উৎসাহিত হবেন।সাংবাদিকদের সাথে পুলিশের পেশাগত বন্ধুত্ব অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে ভাল। এখানে পুলিশ, পুলিশের কার্যক্রম, অনিয়ম সম্পর্কে যখন যা রিপোর্ট করেছেন আমরা সাথে সাথে অ্যাড্রেস করেছি। আপনারা সত্যিকার চতুর্থ স্তম্ভ এটা প্রমাণ করেছেন। আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী জানান, গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৯ জন ডাকাত, ছিনতাইকারী ৪৮ জন, চোর ৯৫ গ্রেপ্তার করা হয়। জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০ জন ডাকাত, ছিনতাইকারী ১০৩ জন, ১০৪ জন চোর গ্রেপ্তার করা হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। ছিনতাইকারীেদের বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স তুলে ধরে। এছাড়াও বিভিন্ন পরোয়ানায় অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে মোট গ্রেপ্তার ২৬৬৭ জন এবং জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩০৪৩ জন৷ গড়ে প্রতি মাসে সহস্র অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গেল রমজানেই শুধু ১১২৯ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
Leave a Reply