
আব্দুল হালিম সাগর: সিলেট মহানগরীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, লুটপাট, মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবীদের ব্যাপক উৎপাত বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে অপরাধীদের বিরুদ্ধে এক প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এসএমপি। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে নগরীর পাড়া-মহল্লা, অলি-গলিতে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছিল। মধ্যরাত থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অপরাধীরা প্রকাশ্যে কিংবা লোকচক্ষুর আড়ালে বিভিন্ন অপরাধ ঘটিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেত। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও অপরাধীদের সমূলে উপড়ে ফেলতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে জুন মাস জুড়ে মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, প্রবেশপথ, আবাসিক এলাকা এবং অপরাধপ্রবণ স্থানগুলোতে ধারাবাহিক বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি একযোগে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করেছে সিলেট মহানগর পুলিশ ও মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত এসব অভিযানে অপরাধীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাৎক্ষণিকভাবে অনেককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হচ্ছে। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন মাসের ৬ তারিখ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত মোট ২২ দিনে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ মোট ৯ দিন বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করেছে। শুধু এই ৯ দিনের চিরুনি অভিযানেই বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ৯৫৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক সাজা প্রদান করা হয়েছে। এর বাইরে মে মাসেও বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৬৬৫ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। মে মাসের ধারাবাহিকতায় জুনেও প্রায় সমান সংখ্যক অপরাধী গ্রেফতারের পরও শতভাগ অপরাধ দমন না হওয়ায় এবার মাদক নির্মূলের মাধ্যমে অপরাধমুক্ত নগর গড়ার একটি বিশেষ ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ বা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এসএমপি। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রেফতারকৃত অপরাধীদের দীর্ঘদিন জেলে আটকে রাখতে বিশেষ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাদকসেবী, মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী কিংবা জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী কাউকে হাতেনাতে প্রমাণসহ আটক করলেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সরাসরি সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জুনের বিভিন্ন তারিখে পরিচালিত চিরুনি অভিযানগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এই ব্যাপক তৎপরতার চিত্র পরিষ্কার হয়ে ওঠে। গত ২৭ জুন শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত মাত্র ৫ ঘণ্টার একটি বিশেষ চিরুনি অভিযানে সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে ৯৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় এসএমপির ৬টি থানা এলাকার মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় ৩২ জন, এয়ারপোর্ট থানায় ১০ জন, জালালাবাদ থানায় ১৪ জন, দক্ষিণ সুরমা থানায় ১৯ জন, মোগলাবাজার থানায় ১৩ জন এবং শাহপরাণ থানায় ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ২৪ জুন বুধবার সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৪ ঘণ্টার অভিযানে ৫৯ জনকে গ্রেফতার করে মহানগর পুলিশ। যার মধ্যে কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ ১৫ জন, এয়ারপোর্ট ৬ জন, জালালাবাদ থানাপুলিশ ৯ জন, দক্ষিণ সুরমা থানাপুলিশ ১৮ জন, মোগলা বাজার থানাপুলিশ ৫ জন ও শাহপরাণ থানা পুলিশ ৬ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তারও আগে ১০ জুন বুধবার একই সময়ে পরিচালিত ৪ ঘণ্টার চিরুনি অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে ১৫৪ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দণ্ড দেওয়া হয়। এই অভিযানে কোতোয়ালী থানায় ৩৪ জন, জালালাবাদে ২১ জন, এয়ারপোর্টে ২৬ জন, দক্ষিণ সুরমায় ২৭ জন, মোগলাবাজারে ১৯ জন এবং শাহপরাণ থানা এলাকা থেকে ২৭ জনকে আটক করা হয়েছিল। এছাড়া ৮ জুন সোমবার ৪ ঘণ্টার এবং ৯ জুন মঙ্গলবার মোগলাবাজার থানায় সাড়ে ১২ ঘণ্টার বিশেষ অভিযানে আরও ১১০ জনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়, যাদের মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় ২৪ জন, জালালাবাদ থানায় ১৪ জন, এয়ারপোর্ট থানায় ২৩ জন, দক্ষিণ সুরমা থানায় ২১ জন, মোগলাবাজার থানায় ৬ জন এবং শাহপরাণ থানায় ২২ জন অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ৬ জুন শনিবার অভিযানের প্রথম দিনেই মাত্র ৪ ঘণ্টার একটি সরাসরি বা ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ অভিযানে মাদকসেবী ও কারবারিসহ ১৩৯ জনকে আটক করে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পুলিশের এই আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপের পর থেকে সিলেটের মাদক ও অপরাধ জগতে এক ধরনের তীব্র অস্থিরতা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এই কঠোর অবস্থানের বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে এসএমপি কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম বলেন, সিলেট মহানগরীকে সম্পূর্ণ মাদক ও অপরাধমুক্ত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। নগরীতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের বিশেষ ও চিরুনি অভিযান ভবিষ্যতেও পুরোদমে অব্যাহত থাকবে। অপরাধ করে বা সাধারণ মানুষের শান্তি বিঘ্নিত করে কেউ পার পাবে না। একই সুর শোনা গেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলমের বক্তব্যেও। তিনি জানান, সিলেট মহানগরীতে কোনো ধরনের অপরাধী বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হবে না। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাসী কার্যক্রম কিংবা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় এমন যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতিতে কাজ করছে এসএমপি। নগরবাসীর জানমাল রক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রধান লক্ষ্য এবং অপরাধী যেই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এদিকে পুলিশের এমন ধারাবাহিক অভিযানের কারণে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। মহানগরীর সচেতন নাগরিকরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের এই কঠোর ভূমিকার কারণে অপরাধীদের তৎপরতা আগের তুলনায় কিছুটা কমে এসেছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় পুলিশের নিয়মিত টহল বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন অনেকটা নিরাপদ বোধ করছেন। আব্দুস সাত্তার নামের এক স্থানীয় ব্যবসায়ী নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, সন্ধ্যার পর আগে অনেক এলাকায় একা চলাচল করতে সাধারণ মানুষের ভয় লাগত এবং ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের উৎপাত ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে এখন নিয়মিত পুলিশি অভিযান ও টহলের কারণে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। নগরবাসী আশা প্রকাশ করেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে পুলিশের এই কঠোর অবস্থান যেন শুধু নির্দিষ্ট কিছু সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে সারা বছর সমানভাবে অব্যাহত থাকে, যাতে করে সব শ্রেণির মানুষ সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে ও নির্ভয়ে চলাচল করতে পারে।
Leave a Reply