
বিশেষ প্রতিনিধি : সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলার পর্যটন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা সীমান্ত জনপদ এখন এক গভীর পরিবেশগত ও সামাজিক সংকটের মুখোমুখি। পাহাড়, নদী ও চা-বাগানের অপরূপ মেলবন্ধন যেখানে পর্যটকদের আকর্ষণ করার কথা, সেখানে অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনকারীদের তাণ্ডবে জনজীবন হয়ে উঠেছে বিপর্যস্ত। ইজারা বহির্ভূত পিয়াইন নদীর তীর, জাফলং চা-বাগান সংলগ্ন কইন্যাজঙ্গল, লুনী, হাজীপুর, আহারকান্দি এবং প্রতাপপুর এলাকায় প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ সম্পদ ধ্বংস করে অবৈধ অর্থ উপার্জনের যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা কেবল প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বরং স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও চা-শ্রমিকদের অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে সক্রিয় রয়েছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যার শীর্ষে রয়েছে রাজনৈতিক খোলস বদলকারী এবং অপরাধ জগতের পরিচিত কিছু মুখ।
গোয়াইনঘাটের চা-বাগান ও সংলগ্ন নদী তীরবর্তী এলাকায় অবৈধ ড্রেজার এবং শক্তিশালী স্যালো মেশিন বসিয়ে বালু ও পাথর উত্তোলনের ঘটনা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। জাফলং চা-বাগানের শত শত একর ভূমি আজ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। ড্রেজার দিয়ে অনবরত বালু ও পাথর তোলার ফলে নদী তীরের জমি ধসে পড়ছে এবং তা নদীর গতিপথ বদলে দিচ্ছে। চা-বাগানের নালা, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, এমনকি শ্রমিকদের একমাত্র খেলার মাঠ ও আবাসন এলাকাও এই ভাঙনের শিকার হচ্ছে। বাগানের লিজ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান অরিয়ন গ্রুপের পক্ষে এবং স্থানীয় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া সত্ত্বেও স্থায়ী কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।
চা-বাগানের সাধারণ শ্রমিকরা চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সামান্য বেতনে দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করা এসব শ্রমিকের কর্মসংস্থান পুরোপুরি নির্ভর করে চা-বাগানের জমির ওপর। একের পর এক জমি নদীগর্ভে হারিয়ে গেলে বাগান কর্তৃপক্ষ উৎপাদন সংকুচিত করতে বাধ্য হবে, যার সরাসরি আঘাত আসবে শ্রমিকদের রুটিরুজির ওপর। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে শ্রমিকরা বারবার হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। স্থানীয় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, চা-শ্রমিকরা যখনই অবৈধ ড্রেজার বসানোর বিরুদ্ধে একজোট হয়েছেন, তখনই চক্রটি তাদেরকে নানা ধরনের মিথ্যা মামলা, যেমন ‘ইমান হত্যা’র মতো গুরুতর অপরাধের ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে রেখেছে। ফলে আইনি সহায়তা পাওয়ার বদলে শ্রমিকরা উল্টো চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। এই অবৈধ বালু মহাল ও সীমান্ত অপরাধের নেপথ্যে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বারবার উঠে এসেছে। এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে তারা এক আতঙ্কের নাম। চক্রের প্রধান হোতাদের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন নিষিদ্ধ সংগঠন যুবলীগের স্থানীয় নেতা কামরুল ইসলাম ও খায়রুল ইসলাম, এবং তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত জুবায়ের আহমেদ। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে নিজেদের রক্ষা করা এবং আধিপত্য বজায় রাখার কৌশল এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এরা সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদের পিএসের ছত্রছায়ায় থেকে পুরো এলাকায় রাজত্ব কায়েম করেছিল। সে সময় জামাই সুমন, আলীম উদ্দিন, সুবাস ও মুজিবের মতো প্রভাবশালী অপরাধীদের সাথে হাত মিলিয়ে তারা মারামারি, ভূমি দখল, চা-বাগানের জমি আত্মসাৎ এবং চাঁদা আদায়ের কাজ সম্পন্ন করত।
সীমান্তে চোরাচালান সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা হিসেবে আলোচিত ব্যক্তি হলেন দুলাল। তিনি গোয়াইনঘাটের পূর্ব-জাফলং এলাকার একটি চোরাকারবারি দলের নেতৃত্ব দেন এবং স্থানীয়ভাবে ‘লাইনম্যান’ হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কার্যক্রম ও চোরাচালানের বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে দুলাল আহমদ ঢালারপার এলাকার মৃত ইদ্রিস প্রকাশ মন্ত্রির ছেলে দুলাল। তবে দুলাল প্রকাশ্যই নিয়ন্ত্রণ করছেন সিমান্তের অপরাধ জগৎ। গোয়াইনঘাট থেকে পুর্ব-জাফলং এলাকার একটি সিন্ডিকেট গ্রুপের দলনেতা দুলাল। কোথায়,কীভাবে,কোন চোরাচালানে মাল লুটপাট করতে হবে—এসবের নির্দেশনা দেন তিনি।তার অপকর্মের ভয়ংকর তথ্য আছে গণমাধ্যম কর্মীদের হাতে।তার এমন দাপট খোদ সিমান্তের বিজিবি প্রশাসনকে’ও দেখান ক্ষমতা। তার এসব কাজে বাধা দেওয়ারমত কেউ আছেন বলে তার মনে হয়না।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত বছরের আগস্ট মাসের ঘটনার পর থেকে এলাকায় রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তিত হলেও এই অপরাধ চক্রটি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে অত্যন্ত চতুরতার সাথে। তারা রাতারাতি খোলস বদলে বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার রাজনৈতিক আশ্রয়ে চলে যায় এবং বালু ও পাথর মহালে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। কামরুল ইসলাম নিজেকে ‘মেসার্স কামরুল ইসলাম এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ক্ষমতার নতুন ভরকেন্দ্রের দোহাই দিয়ে সীমান্ত এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখে। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরীর নাম ভাঙিয়ে এলাকা জুড়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কোটি কোটি টাকার সম্পদ লুটপাটের মারাত্মক অভিযোগ উঠে এসেছে এই কামরুলের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, জুবায়ের আহমেদের উত্থানের গল্প যেকোনো সিনেমার কাহিনিকেও হার মানায়। মাত্র কয়েক বছর আগেও জাফলং গুচ্ছগ্রাম এলাকায় একটি সাধারণ কসমেটিকসের দোকান চালিয়ে জীবনধারণ করা জুবায়ের ২০২০ সালে বিজিবির তৎকালীন কিছু অসচ্ছল ও অসাধু কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশ করে সীমান্ত চোরাচালানের জগতে প্রবেশ করেন। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যে বালু লুটপাট, পাথর কালোবাজারি এবং সীমান্ত চোরাচালানের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যান তিনি। আজ তিনি বিলাসবহুল গাড়ি, সিলেটে আলিশান বাড়ি এবং বিদেশ ভ্রমণের মালিক। অথচ তার নিজের বাবা এখনো একটি সাধারণ মসজিদে ইমামতি করে জীবনযাপন করছেন। জুবায়েরের এই অস্বাভাবিক ও অবৈধ সম্পদের ওপর নজর পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক), এবং তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
রাজনীতিকে ব্যবহার করে অপরাধ ঢেকে রাখার কৌশল জুবায়ের অত্যন্ত সুনিপুণভাবে প্রয়োগ করেছেন। ৫ আগস্টের পর তিনি যুবদলের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে নিজেকে জাহির করতে শুরু করেন এবং উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, সিলেটের স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের অনেক বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকে এই অবৈধ বালু ব্যবসার বখরা বা অংশীদার বানিয়ে তাদের মুখ বন্ধ রাখা হয়েছে। জুবায়েরের এই অপকর্মের কারণে গোয়াইনঘাট উপজেলা যুবদল ও বিএনপির ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দলটির ত্যাগী ও প্রবীণ নেতারা। তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, একজন চোরাকারবারি ও পরিবেশ বিধ্বংসী অপরাধীর কাছে পুরো সংগঠন জিম্মি হয়ে পড়তে পারে না।
এই সিন্ডিকেটের অপরাধ কেবল নদীর বালু উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত অপরাধের সাথেও গভীরভাবে জড়িত। জাফলং চা-বাগান এবং পার্শ্ববর্তী সীমান্ত ফাঁড়ির নিরিবিলি পথ ব্যবহার করে ভারতের সীমান্ত থেকে অবৈধ মদ, নিষিদ্ধ অস্ত্র, ভারতীয় ওষুধ, কসমেটিকস, অবৈধ চিনি এবং গরু চোরাচালানের মূল রুটের নিয়ন্ত্রণ এই চক্রের হাতে। স্থানীয় ভাষায় একে ‘বুংগা’ চোরাচালান বলা হয়। নদীপথে যেসব ট্রলার বা ‘বগলি বোট’ বালু ও পাথর পরিবহন করে, সেগুলোর কাছ থেকে জোরপূর্বক ‘লাইন মানি’ বা চাঁদা আদায় করা এই বাহিনীর দৈনন্দিন কাজের অংশ। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে নৌকার মাঝিদের ওপর নির্যাতন ও নৌকা জব্দ করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। লুটপাটের ভাগবাটোয়ারা এবং এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই চক্রের ভেতরের কোন্দলও বারবার রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি লুনী ও কইন্যাজঙ্গল গ্রামে বালুমহালের দখল নিয়ে দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে মারাত্মক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দফায় দফায় হামলা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও গোলাগুলীর ঘটনায় অন্তত ১৪ জন সাধারণ গ্রামবাসী মারাত্মকভাবে আহত হন। কিন্তু এই চক্রের নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রমাণ পাওয়া যায় তোফায়েল আহমদ নামের এক স্থানীয় বাসিন্দার ওপর চালানো পৈশাচিক নির্যাতনে। বালুমহাল নিয়ে বিরোধের জের ধরে জুবায়েরের সন্ত্রাসী অনুসারীরা তোফায়েলের বাড়িতে হামলা চালায় এবং আক্রমণকারীরা তোফায়েলের বৃদ্ধ বাবার একটি আঙুল শরীর থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, সেই কাটা আঙুলটি জুবায়েরের কাছে ‘উপহার’ হিসেবে পৌঁছে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই জামিন-অযোগ্য ও নৃশংস অপরাধটিকে ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা অপরাধ দমনে স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারছে না। গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং বিজিবি ও পুলিশের যৌথ সহায়তায় গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স বিভিন্ন সময়ে ইজারা বহির্ভূত কইন্যাজঙ্গল ও হাজীপুর এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ ড্রেজার মেশিন, স্যালো নৌকা এবং বালু পরিবহনের পাইপ আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে এবং কিছু শ্রমিককে আটক বা জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু অভিযানের মূল লক্ষ্য যারা, সেই কামরুল, খায়রুল ও জুবায়ের সবসময়ই অধরা থেকে যান। স্থানীয় সূত্রের খবর, প্রশাসনের অভিযানের তথ্য আগেভাগেই গোপন সূত্রে পেয়ে তারা আত্মগোপনে চলে যান। আর টাস্কফোর্সের গাড়ি এলাকা ত্যাগ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবারও দ্বিগুণ উৎসাহে নদী ও বাগান থেকে বালু উত্তোলনের দানবীয় যন্ত্রগুলো সচল হয়ে ওঠে। বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। একদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে নদীভাঙন দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে সন্ত্রাসী বাহিনীর চাঁদাবাজি ও হামলায় শান্ত পরিবেশ অশান্ত হয়ে উঠেছে। গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের নবাগত কর্মকর্তারা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও সাধারণ মানুষের দাবি কেবল মৌখিক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত অপরাধীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা হোক। চা-বাগানের লিজ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান, চা-শ্রমিক এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোর দাবি, অবিলম্বে অবৈধ ড্রেজার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে পিয়াইন নদী ও জাফলং চা-বাগানকে রক্ষা করা হোক এবং কামরুল, খায়রুল ও জুবায়ের সিন্ডিকেটের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
Leave a Reply