
বিশেষ প্রতিবেদক: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি ও কেনাকাটা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বদলি বাণিজ্য ও পদায়নের মাধ্যমে বেআইনিভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ অর্জনের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের এটিই প্রথম অনুসন্ধানী পদক্ষেপ, যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গতকাল বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এক প্রেস ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকে তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের আমালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য আসার পর তা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া হয়েছে। সাবেক এই উপদেষ্টার পাশাপাশি তৎকালীন প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের অন্য প্রধান সদস্যদের বিরুদ্ধেও দুদক অনুসন্ধানে নেমেছে। অভিযুক্ত বাকি তিন কর্মকর্তা হলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, সাবেক যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং যুব-১ শাখার সাবেক উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ। দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে পদায়ন, পদোন্নতি ও কেনাকাটায় কয়েক কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে। দুদকে আসা নথিপত্র ও অভিযোগ পর্যালোচনা করে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য ও পদোন্নতির বিনিময়ে আনুমানিক ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা অবৈধ উপায়ে সংগ্রহের প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই দুর্নীতির প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিভিন্ন অধিদপ্তর ও শাখায় নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। অভিযোগের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনস্থ বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক ঘুষ লেনদেন। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে নিজ নিজ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সুবিধাজনক ও নতুন জায়গায় পদায়নের প্রশাসনিক আদেশ জারির বিনিময়ে প্রায় ৭৬ লাখ টাকা অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়। এ ছাড়া ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির ফাইল অনুমোদনের বিপরীতে প্রায় দেড় কোটি টাকা আদায় করার অভিযোগ রয়েছে। এই কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর তাদের পছন্দের জেলা ও উপজেলায় পদায়ন সুনিশ্চিত করার নামে আরও প্রায় ২ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগে তথ্য মেলে। এসব অনিয়মের পেছনে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন ও প্রশাসনিক একাধিক কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল বলেও দুদকের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ পাওয়া যায়। নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্যের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কেনাকাটা ও উন্নয়ন প্রকল্পে একটি শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলা হয়েছিল। সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, সাবেক যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ সমন্বিতভাবে এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ উঠে এসেছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন অবকাঠামোগত টেন্ডার, সরঞ্জাম কেনাকাটা ও প্রশাসনিক প্রকল্পের কাজ পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বেআইনি কমিশন আদায় করা হতো। এর বাইরেও ঘুষ গ্রহণ, মানিলন্ডারিং, বিদেশে অর্থপাচার, বিটকয়েন লেনদেন, চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট অঞ্চলপ্রীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা পড়ে। সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত অভিযোগগুলোর আইনগত এবং নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের স্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশন ৪ সদস্যের একটি শক্তিশালী অনুসন্ধান দল গঠন করেছে। অনুসন্ধান টিমের প্রধান বা দলনেতা করা হয়েছে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামকে। টিমের অন্য তিন সদস্য হলেন সহকারী পরিচালক মো. নাছরুল্লাহ হোসাইন, উপসহকারী পরিচালক ইমরান আকন এবং উপসহকারী পরিচালক রোমান উদ্দিন। দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে টিমটি খুব শিগগিরই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে বিগত সময়সূচির নিয়োগের সার্কুলার, বদলির প্রশাসনিক আদেশ, পদোন্নতি সংক্রান্ত ফাইল, টেন্ডারের নথিপত্র এবং আর্থিক লেনদেনের কাগজপত্র তলব ও সংগ্রহ করবে। একই সঙ্গে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং অর্জিত সম্পদের যাবতীয় তথ্যও খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের খাতিরে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদসহ অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দুদক কার্যালয়ে হাজির হতে নোটিশ দেওয়া হবে এবং তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করা হবে। দুদকের অনুসন্ধানে অনিয়ম ও দুর্নীতির চূড়ান্ত ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিললে আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।