ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ থেকে বাঙালির চিরন্তন মহানায়ক: এক অমর যাত্রার গল্প

দৈনিক বাংলা সংবাদ
প্রকাশিত 02 September, Wednesday, 2026 22:18:59
ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ থেকে বাঙালির চিরন্তন মহানায়ক: এক অমর যাত্রার গল্প

ফিচার: পর পর সাতটি ছবিতে অভিনয় করলেন তিনি, অথচ সবগুলো ছবিই বক্স অফিসে চরমভাবে ব্যর্থ। বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি তখন যেন হাসি-তামাশার পাত্র, চারপাশের মানুষ ডাকনাম দিল ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’। অথচ এই মানুষটিই যে একদিন কোটি বাঙালির হৃদয়ের মধ্যমণি হয়ে উঠবেন, তা হয়তো সেদিন খোদ ইন্ডাস্ট্রির কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামের সেই সাধারণ যুবকটির মহানায়ক উত্তম কুমার হয়ে ওঠার পথটা মোটেই মসৃণ ছিল না। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ছেলেবেলায় অংকে ফেল করার গল্পের মতো উত্তম কুমারের ক্যারিয়ারের শুরুতেও ছিল কেবল পরাজয়ের গ্লানি ও অদম্য সংগ্রামের ইতিহাস। সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কলকাতা পোর্ট কমিশন অফিসে দশটা-পাঁচটার কেরানির চাকরি করতেন তিনি। এর মাঝেও অভিনয়প্রীতির টানে ছুটে যেতেন থিয়েটারে। ১৯৪৭ সালে ‘মায়াডোর’ ছবিতে প্রথম সুযোগ পেলেও সেটি আলোর মুখ দেখেনি। পরের বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প অবলম্বনে তৈরি ‘দৃষ্টিদান’ সিনেমায় নায়কের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করে পান সাড়ে ১৩ টাকা। তবে সিনেমার বিজ্ঞাপনে নিজের নাম না দেখে চরম আশাহত হয়েছিলেন। এরপর একের পর এক ব্যর্থতা সত্ত্বেও হাল ছাড়েননি উত্তম কুমার। নিজেকে ভাঙা-গড়ার খেলায় মেতে উঠেছেন প্রতিদিন, নিজের উচ্চারণ ও এক্সপ্রেশনের খুঁতগুলো শুধরেছেন নিজের মতো করে। অবশেষে ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ ছবির মাধ্যমে বক্স অফিসে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখেন তিনি। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ কিংবা সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’—একের পর এক কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি নিজের নাম খোদাই করে নেন ইতিহাসের পাতায়। সহশিল্পীদের প্রতি তাঁর অমায়িক আচরণ ছিল প্রবাদতুল্য। অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর যেমন স্মৃতিচারণ করে লিখেছিলেন, এত বড় তারকা হওয়া সত্ত্বেও উত্তম কুমার কখনো তাঁর ওপর জ্যেষ্ঠতার অহংকার চাপিয়ে দেননি, যার ফলে নতুনরাও তাঁর পাশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভিনয় করতে পারতেন। খ্যাতি আর জনপ্রিয়তার সাথে সাথে তাঁর জীবনে এসেছে নানা বিড়ম্বনা ও রসালো ঘটনা। অনুরাগীদের অতিরিক্ত পাগলামি থেকে শুরু করে হঠাৎ ময়দানে হেঁটে যাওয়ার পথে পথচারীদের অবিশ্বাস—সবই তিনি উপভোগ করেছেন বেশ কৌতুকভরে। আবার নিজের জন্মদিন পালন নিয়ে ছিল তাঁর এক অদ্ভুত ও মিষ্টি স্বভাব। ৩ সেপ্টেম্বর নিজের জন্মদিনে অনুষ্ঠান না করে, ২৭ সেপ্টেম্বর স্ত্রী গৌরী চট্টোপাধ্যায় ও ছেলে গৌতমের জন্মদিনের সাথে মিলিয়ে উদযাপন করতেন পুরো উৎসব। সেখানে মুম্বাই থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আর ডি বর্মণ কিংবা কিশোর কুমারের মতো সংগীত রথীরাও হাজির হতেন। উত্তম কুমার মানেই বাঙালির কাছে সুচিত্রা সেনের সাথে সেই অনবদ্য রোমান্স, বাইকে চেপে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গান কিংবা সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সাথে পর্দায় অনন্য রসায়ন। তবে উত্তম কুমারের সাফল্য কেবল নির্দিষ্ট কোনো জুটিতে আটকে ছিল না, তাঁর অভিনয়ের বহুমুখী বৈচিত্র্যই তাঁকে বারবার নতুন করে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। আজকের জেন-জি কিংবা জেন-আলফার দ্রুতগতির ওটিটি যুগে এই গভীর আবেগের ব্যাখ্যা মেলা হয়তো কঠিন। তবে একলা কোনো অলস দুপুরে বা ঝুম বৃষ্টির রাতে যখন ভেসে আসে ‘তুমি না হয় রহিতে কাছে…’, তখন আজও বুকটা কেমন যেন ছাঁত করে ওঠে। মহানায়ক উত্তম কুমার স্রেফ কতগুলো সুপারহিট সিনেমার স্মৃতি নন; তিনি লুকিয়ে আছেন আমাদের মা-বাবার প্রথম মোলাকাতের লাজুক হাসিতে, পুরোনো অ্যালবামের পাতায় আর বাঙালির ভালোবাসতে শেখার প্রথম পাঠে। পর্দার আলো নিভে গেলেও, সাদা-কালো ক্যানভাসের সেই একটুখানি বাঁকা হাসি আজও আমাদের চুপিচুপি বলে যায়—তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম।

Su Mo Tu We Th Fr Sa
02 September 2026

ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ থেকে বাঙালির চিরন্তন মহানায়ক: এক অমর যাত্রার গল্প

বিস্তারিত কমেন্টে