1. halimshagor2011@gmail.com : bangla sangbad : bangla sangbad
  2. admin@dainikbanglasangbad.com : H@dainikbS :
মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৭ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :
‘পরকীয়া’ নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে সিলেটে ব্যবসায়ী খুন! বেপরোয়া ক্রেনের চাপায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীর মৃত্যু, ক্রেনচালক গ্রেপ্তার সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক হলেন বদরুজ্জামান সেলিম গোয়াইনঘাটে নদী ও চা-বাগান গিলছে ‘কামরুল-খায়রুল-জুবের-দুলাল’ সিন্ডিকেট সিলেটের তামাবিল ও জাফলংয়ে আ.লীগ বিএনপি লুটপাট সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে শাহপরাণ সিলেটে আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের মোড় কোন দিকে যাচ্ছে ? সারাদেশে নামসর্বস্ব ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যুর ফাঁদ ‘অপরাধের বিরুদ্ধে এসএমপির ‘জিরো টলারেন্স’ সিলেটে একের পর এক চিরুনি অভিযান সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীর বালু সিন্ডিকেটের কাছে প্রশাসনের মতো অসহায় স্থানীয় এমপি

পিরোজপুরে ৬শ কোটি টাকার প্রকল্পে ভয়াবহ জালিয়াতি, কাজ না করে ৯১ কোটি টাকা হাওয়া

  • আপটেড সময় : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার পঠিত

আব্দুল হালিম সাগর:  এক ইঞ্চি কাজ না করেই তুলে নেওয়া হয়েছে প্রকল্পের ৯১ কোটি টাকা। আর কাগজে-কলমে বাস্তব অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৭৭ শতাংশ। সরকারি অর্থায়নে গৃহীত পিরোজপুর জেলার সাতটি উপজেলায় ৪৮০ কিলোমিটার গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা পাকাকরণের ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে উঠে এসেছে জালিয়াতি ও হরিলুটের এই ভয়াবহ চিত্র। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সরেজমিন প্রতিবেদন, অডিট আপত্তি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের মেজারমেন্ট বুক (এমবি) ও ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই ভুয়া বিল পাস করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। অনিয়মের পেছনে সাবেক সংসদ সদস্য, এলজিইডির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এবং জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের (এজি অফিস) এক শ্রেণির কর্মকর্তার একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সরাসরি জড়িত বলে অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, পিরোজপুর জেলায় নিবন্ধিত মোট ৫,৮১৯ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কের মধ্যে ৪,৪৭৪ কিলোমিটারই কাঁচা। এই বিশাল জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে এবং গ্রাম, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত সহজ করার লক্ষ্যে ২০২১ সালের ১৬ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। শতভাগ সরকারি অর্থায়নে গৃহীত এই প্রকল্পের সময়সীমা ছিল এপ্রিল ২০২১ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত। পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর, নেছারাবাদ, ভান্ডারিয়া, কাউখালী, চালনা/ইন্দুরকানি ও মঠবাড়ীয়া—এই সাতটি উপজেলার ৪৭৯.৬২ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকাকরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যেখানে প্রতি কিলোমিটারে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় সোয়া কোটি টাকা।
আইএমইডি ও দুদকের তদন্তে প্রকল্পের বাস্তবায়নে চরম দুর্নীতি ও অনিয়মের নানা তথ্য সামনে এসেছে। মাঠে বিন্দুমাত্র কাজ না করেই সম্পূর্ণ ভুয়া ৩১টি প্যাকেজ বা স্কিম দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে ৯০ কোটি ৮৬ লাখ ১৯ হাজার টাকা, যা থেকে ভ্যাট ও আয়কর বাদ দিয়ে সরাসরি পকেটে গেছে ৭৭ কোটি ২৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা। এছাড়া ৪৭টি প্যাকেজে কাজের বাস্তব অগ্রগতির চেয়ে ৩ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত বিল তুলে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রকল্পে মোট ২১৩টি প্যাকেজের মধ্যে কাজের অগ্রগতি ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ হওয়ার পর গত দুই বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বহু কাজ, আর ৩২টি প্যাকেজের অগ্রগতি শতভাগ শূন্য। তা সত্ত্বেও ৪৪১ কোটি ১৪ লাখ টাকা অর্থছাড় ও ব্যয় দেখিয়ে প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি ৭৭.৭৭ শতাংশ দাবি করা হয়, যা বাস্তবে সম্পূর্ণ কাল্পনিক। ডিপিপির নথির সঙ্গে সরেজমিন বাস্তবতার তুলনামূলক চিত্রে চরম প্রতারণা উঠে এসেছে। ভান্ডারিয়া মহিলা কলেজ থেকে পূর্ব ভান্ডারিয়া মন্ত্রিবাড়ি রোড ভায়া খন্দকার বাড়ি রোডে বিসি রাস্তা ও ৩টি কালভার্ট নির্মাণের কথা বলে ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হলেও বাস্তবে রাস্তাটি সম্পূর্ণ কাঁচা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। শ্রীপুর শিকদার হাট থেকে বলগার ব্রিজ রোডে কোনো কাজ না করেই আত্মসাৎ করা হয়েছে ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। একইভাবে মাটিভাঙা-কাঠালিয়া বর্ডার রোডে ১২টি কালভার্ট ও বিসি রাস্তার নামে ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং রাজপাশা স্টিল ব্রিজ থেকে মহিলা মাদ্রাসা রোডে সামান্য ইটের খোয়া ফেলে ৩ কোটি ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগে উঠে এসেছে তীব্র ক্ষোভ। ভান্ডারিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা মহারাজ সিকদার জানান, এলাকায় কোনো কাজই হয়নি, অথচ কাগজপত্রে সব টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় পড়ছেন পথচারীরা। অপর বাসিন্দা ওমর সরদার জানান, কোনো সরকারি সংস্কার না পেয়ে স্থানীয়রা নিজেরা চাঁদা তুলে তিন হাজার ইট ও বালি দিয়ে পথটি চলাচলের যোগ্য করার চেষ্টা করেন, যা সামান্য বৃষ্টিতেই কাদায় ঢেকে যায়। ফলে জরুরি প্রয়োজনে কোনো রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ারও উপায় থাকে না। স্বাভাবিক নিয়মে উপজেলা প্রকৌশলীর সই ও মেজারমেন্ট বুকের তথ্যের ভিত্তিতে বিল পাস হওয়ার কথা থাকলেও পিরোজপুরে তা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। পিরোজপুর সদর উপজেলার এলজিইডির নবনিযুক্ত প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ইমতিয়াজ হোসাইন রাসেল জানান, উপজেলা অফিসকে সম্পূর্ণ বাইপাস করে জেলা কার্যালয়, এজি অফিস ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে সরাসরি জেলা থেকেই বিল পাস করা হয়। কোনো সহায়ক নথি ছাড়া কেবল কন্টিনজেন্সি ফরমে লামসাম টাকার পরিমাণ বসিয়ে ভুয়া বিল ছাড় করা হয়েছিল। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করতে দফায় দফায় প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বদল করা হয়। সুশান্ত রঞ্জন রায় ও আদনান আখতারুল আজমের পর পিডি হিসেবে আসেন মো. ইব্রাহিম খলিল, যার দুই বছরের দায়িত্বকালীন সময়েই সবচেয়ে বড় আর্থিক লুটপাট ঘটে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও রহস্যজনকভাবে তাকেই আবার পিডি পদে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে সাবেক পিডি ইব্রাহিম খলিল তার দায় অস্বীকার করে দাবি করেন, বিল পাস করার মূল দায়িত্ব মাঠপর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীর। জেলা এজি অফিসের সঙ্গে মিলে তারা নথি ছাড়া কীভাবে টাকা ছাড় করেছে, তা পিডি কার্যালয়ের জানা ছিল না। অন্যদিকে পিরোজপুরের ডেপুটি অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল পলাশ চৌধুরী জানান, অফিশিয়াল নথিপত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন থাকলে এজি অফিস বিল পাস করতে বাধ্য থাকে, কারণ সরেজমিনে কাজ তদারকি করার সুযোগ তাদের থাকে না। প্রকল্পটির আর্থিক শৃঙ্খলা পর্যালোচনায় চরম ব্যত্যয় ধরা পড়েছে। মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) অডিটে অননুমোদিতভাবে ১২৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ ও ব্যয়, মূল ডিপিপির বাইরে গিয়ে দরপত্র অনুমোদন এবং সম্পূর্ণ ভুয়া বিলে ১০ লাখ টাকা উত্তোলনের মতো মোট ১২৮ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি চিহ্নিত হয়েছে। আর্থিক পরিকল্পনার এই খামখেয়ালি ফুটে ওঠে ২০২২-২৩ অর্থবছরেও, যেখানে ডিপিপিতে ১১৭.৭৪ কোটি টাকার পরিকল্পনা থাকলেও নিয়মের বাইরে গিয়ে এডিপিতে ২১২.৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং পুরোটাই ব্যয় দেখানো হয়। এমনকি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিপিপিতে কোনো সংস্থান না থাকা সত্ত্বেও এডিপিতে নতুন করে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পিরোজপুর জেলায় এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ব্যাপক তদন্ত চালাচ্ছে। দুদকের পিরোজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ, এলজিইডির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নিজস্ব ও নিয়ন্ত্রণাধীন ৮টি ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে এই বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই ঘটনায় ইতোমধ্যে আটটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন। তবে মূল অভিযুক্তরা বর্তমানে বিদেশে পলাতক রয়েছেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ও শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য ড. এনামুল হক বলেন, এক ইঞ্চি কাজ না করে বিল তুলে নেওয়া সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ। এর প্রথম দায় প্রকল্প পরিচালকের, কারণ সত্যায়ন ছাড়া অর্থ উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। তিনি দুদকের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি নতুন প্রাক্কলনের মাধ্যমে প্রকল্পটির কাজ পুনরায় শুরু করার ওপর জোর দেন। আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট জানিয়েছে, অনুমোদিত মেয়াদ শেষ হওয়ার এতদিন পর আবেদন পাঠানোয় সরকারি বিধি অনুযায়ী এই প্রকল্পের সময়সীমা আর বাড়ানো সম্ভব নয়। সংস্থাটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রকৃত অগ্রগতি নিরূপণ, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নতুন দরপত্রের মাধ্যমে অসমাপ্ত কাজ শেষ করে দ্রুত প্রকল্প সমাপ্তির সুপারিশ করেছে। পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন জানান, বন্ধ হয়ে থাকা কাজগুলো নতুন করে চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং গত ৯ আগস্ট সচিবালয়ে আয়োজিত সভায় আইনি জটিলতা নিরসন করা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, যেখানে কাজ থমকে আছে, সেখান থেকেই নতুন এস্টিমেট তৈরি করে নতুন দরপত্রের মাধ্যমে দ্রুত কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। একই সাথে দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। প্রশাসনের সর্বস্তরের নজরদারি এড়িয়ে মেগা প্রকল্পে এমন প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের ঘটনায় দোষীদের শাস্তি এবং দ্রুত রাস্তা সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন ভূক্তভোগী এলাকাবাসী।

Share this news as a Photo Card

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরো কিছু জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2018 dainikbanglasangbad.com
Design & Development By Hostitbd.Com
19 August 2026

পিরোজপুরে ৬শ কোটি টাকার প্রকল্পে ভয়াবহ জালিয়াতি, কাজ না করে ৯১ কোটি টাকা হাওয়া

Dainik Bangla Sangbad.Com