1. halimshagor2011@gmail.com : bangla sangbad : bangla sangbad
  2. admin@dainikbanglasangbad.com : H@dainikbS :
মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫০ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :
‘পরকীয়া’ নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে সিলেটে ব্যবসায়ী খুন! বেপরোয়া ক্রেনের চাপায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীর মৃত্যু, ক্রেনচালক গ্রেপ্তার সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক হলেন বদরুজ্জামান সেলিম গোয়াইনঘাটে নদী ও চা-বাগান গিলছে ‘কামরুল-খায়রুল-জুবের-দুলাল’ সিন্ডিকেট সিলেটের তামাবিল ও জাফলংয়ে আ.লীগ বিএনপি লুটপাট সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে শাহপরাণ সিলেটে আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের মোড় কোন দিকে যাচ্ছে ? সারাদেশে নামসর্বস্ব ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যুর ফাঁদ ‘অপরাধের বিরুদ্ধে এসএমপির ‘জিরো টলারেন্স’ সিলেটে একের পর এক চিরুনি অভিযান সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীর বালু সিন্ডিকেটের কাছে প্রশাসনের মতো অসহায় স্থানীয় এমপি

# আইনি ফাঁকফোকর, জালিয়াতি। # পেশিশক্তির দাপটে বিপন্ন প্রকৃতির স্বর্গ।  # কাগজের উচ্ছেদে বাস্তবে দখলদারদের রাজত্ব।  # জড়িত বন ও চা বাগানের কর্মকর্তারা।
সিলেটে বন ও চা-বাগানের ৫৮ হাজার একর ভুমি জবর দখল

  • আপটেড সময় : বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
  • ১১ বার পঠিত

আব্দুল হালিম সাগর: সিলেটের চিরসবুজ বনাঞ্চল, দেশের ফুসফুস খ্যাত সংরক্ষিত উদ্যান আর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত চা-বাগান এখন এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখোমুখি। একদিকে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের আগ্রাসন, অন্যদিকে প্রশাসনিকের দুর্বলতা, তীব্র জনবল সংকট এবং দশকের পর দশক ধরে ঝুলে থাকা আইনি জটিলতা সব মিলিয়ে সিলেটের প্রকৃতিকে গিলে খাচ্ছে এক সংগঠিত ছায়া অর্থনীতি। সরকারি নথিপত্র এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিলেট বন বিভাগের মোট ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭১৪ একর জমির মধ্যে প্রায় ৫৮ হাজার একরই এখন অবৈধ দখলে। অর্থাৎ, বনাঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি জমি এখন সরকারের হাতছাড়া। শুধু বনভূমিই নয়, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মালনীছড়া, লাক্কাতুরা কিংবা সাবাজপুরের মতো চা-বাগানের শত-শত একর মূল্যবান ভূমিও এখন জালিয়াতি ও পেশিশক্তির কবলে পড়েছে।
বন বিভাগের প্রস্তুত করা গোপন তালিকা এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২০ সালে প্রস্তুতকৃত ওই তালিকা অনুযায়ী, মাত্র ১০ জন শীর্ষ প্রভাবশালী ব্যক্তি মিলে সিলেট অঞ্চলের অন্তত ৩২৫ একর সংরক্ষিত বনভূমি জবরদখল করে রেখেছেন। এদের মূল আস্তানা সিলেটের গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়। এই তালিকায় থাকা গোয়াইনঘাটের সাতীর হাওর এলাকার ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৫০ একর বনভূমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কোম্পানীগঞ্জের দিঘলবাকপাড় এলাকার কল্যাণ বিশ্বাস ৪৫ একর, সাতীর হাওরের চেরাগ আলী ৪০ একর এবং একই এলাকার জবেশ ৩২ একর জমি দখল করে রেখেছেন। রাতারগুল এলাকার আব্দুল হামিদ ও শিমুলবিল হাওরের শামসুল ইসলাম প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ৩০ একর করে জমি দখলের প্রমাণ পেয়েছে বন বিভাগ। তালিকায় আরও নাম রয়েছে কোম্পানীগঞ্জের তোফায়েলের ২৬ একর, মাহবুবুর রহমান জীবনের ২৫ একর এবং সৈয়দুর রহমানের ২২ একর বনভূমি জবরদখলের বিবরণ। যদিও অভিযুক্তরা বিভিন্ন সময় দাবি করেছেন যে তারা পতিত জমিতে কৃষিকাজ করছেন বা জমিগুলোর ওপর তাদের নিজস্ব স্বত্ব রয়েছে, তবে বন বিভাগের দাবি—স্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থবল খাটিয়ে এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ, কৃষিকাজ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
সরকারি হিসাব মতেই, বনের জমি সবচেয়ে বেশি বেদখল হয়েছে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায়। এই একটি উপজেলাতেই ২০,১৭৪ একর বনভূমি অবৈধ দখলে চলে গেছে। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট এবং নিয়াগুল হাওর সংলগ্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল এখন তীব্র অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। বেদখল ঠেকাতে নিয়াগুল হাওরের লক্ষ্মীপুর বিটের ৭৫ হেক্টর জমি উদ্ধারের পর বন বিভাগ সেখানে ঐতিহ্যবাহী মুর্তা বা পাটিবেত বাগান করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী মারুফ মিয়া ও মাসুদ মিয়ার নেতৃত্বে একদল দুষ্কৃতকারী লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালিয়ে সব মুর্তা গাছ কেটে জমিটি পুনর্দখল করে নেয় এবং বাধা দিতে গিয়ে রক্তাক্ত হন বেশ কয়েকজন বনকর্মী। অভিযুক্তরা প্রকাশ্যেই সংবাদমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেন যে বন বিভাগ তাদের জমিতে গাছ লাগিয়েছিল বলেই তারা তা কেটে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে, লেঙ্গুরা ইউনিয়নে বন বিভাগের প্রায় ৫০ একর মুর্তা বাগান দখল করে নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তুলে ধান চাষ করার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় চক্রের বিরুদ্ধে। বনভূমির পাশাপাশি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চা-বাগানগুলোর জমিও এখন ভূমিদস্যুদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ভুয়া কাগজপত্র ও স্মারক জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা চলছে। সরকারি মালিকানাধীন ন্যাশনাল টি কোম্পানির অধীনে থাকা লাক্কাতুরা চা-বাগানের প্রায় ২৬ একর জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্মারক জালিয়াতির মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী চক্র নিজেদের নামে নামজারি করে নেয়। প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যের এই সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের ঘটনাটি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের নিবিড় অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। গোয়াইনঘাটের ফতেহপুর চা-বাগানের ৩১.৮ একর সরকারি ভূমি দীর্ঘ জবরদখল শেষে সম্প্রতি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন যৌথ অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করেছে। অন্যদিকে, মৌলভীবাজারের বড়লেখার স্কয়ার গ্রুপের মালিকানাধীন সাবাজপুর চা-বাগানের প্রায় ৫৫০ একর জমি পার্শ্ববর্তী বোবারথল গ্রামের কিছু বাসিন্দা নিজেদের দাবি করে জবরদখলের চেষ্টা চালায়। বাগান কর্তৃপক্ষ বাধা দিলে তারা নির্মমভাবে কচি চা-গাছ উপড়ে ফেলে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে। এমনকি ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা-বাগান মালনীছড়াও বেদখলের থাবা থেকে রেহাই পায়নি। গত ১৬৮ বছরে অবৈধ দখল, ত্রুটিপূর্ণ লিজ এবং নগরায়ণের নামে রাস্তা ও স্থাপনা নির্মাণের ফলে বাগানটির আদি আয়তন থেকে প্রায় ১১ হাজার একর ভূমি হারিয়ে গেছে।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বন্যপ্রাণীর অন্যতম প্রধান অভয়ারণ্য হলেও এর লাউয়াছড়া বিটের জমি দখল করে গড়ে উঠেছে বাগমারা নামের আস্ত একটি আধা-শহুরে গ্রাম। বনের জমি কেটে তৈরি করা হয়েছে বিলাসবহুল রিসোর্ট, আনারস বাগান এবং পানের বরজ। কয়েক বছর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং জাতীয় গণমাধ্যমে লাউয়াছড়ার এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে উঠলেও বাস্তবে উচ্ছেদ হয়েছে নামমাত্র। সম্প্রতি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংসদ সদস্যরাও পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে রিসোর্ট গড়ে ওঠার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তবে এই দখল প্রক্রিয়ার পেছনে বন বিভাগের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় আদিবাসীরা। খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে, তারা এই বনের আদি বাসিন্দা হিসেবে যুগ যুগ ধরে বন রক্ষা করলেও বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বহিরাগতরা এসে বনের ভেতর গ্রাম ও রিসোর্ট বানাচ্ছে। অথচ বন বিভাগ আদিবাসীদের পুঞ্জিগুলোতে বিদ্যুৎ আসতে দিচ্ছে না। এই দখল সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক জটিলতা হলো ৪ ধারা ও ২০ ধারার গোলকধাঁধা। সিলেট বন বিভাগের মোট বনাঞ্চলের মধ্যে সংরক্ষিত বা ২০ ধারাভুক্ত জমি ১ লাখ ১১ হাজার ৯৪৩ একর এবং প্রস্তাবিত বনভূমি বা ৪ ধারা হিসেবে রয়েছে ৪২,৭৭০ একর। প্রস্তাবিত ৪ ধারার জমিগুলোর তদারকির দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। বন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, গত শতকের ষাটের দশকে এই জমিগুলো চিহ্নিত করা হলেও আজ পর্যন্ত এগুলোকে গেজেটভুক্ত করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয়নি। উল্টো জেলা প্রশাসন অনেক সময় বন বিভাগের সাথে আলোচনা না করেই এই প্রস্তাবিত বনের জমি বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংস্থাকে ইজারা দিয়ে দেয়, যা পরোক্ষভাবে দখলদারিত্বকে আইনি রূপ দেয়। তবে জেলা প্রশাসন এই অভিযোগ অস্বীকার করে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণের দাবি জানিয়েছে। এর সাথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আদালতের দীর্ঘসূত্রতা। বর্তমানে ৩০ হাজার একরেরও বেশি বেদখল ভূমি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে, যার কোনো কোনোটি ২০ থেকে ২২ বছর ধরে ঝুলে আছে। উচ্ছেদ অভিযান চালালেই দখলদাররা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে, ফলে থমকে যায় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। বনভূমি ধ্বংস ও শ্রেণী পরিবর্তনের ফলে বনের বাস্তুতন্ত্র সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। আবাসস্থল ও খাদ্য হারিয়ে বন্যপ্রাণী এখন প্রতিনিয়ত লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এই সংঘাত এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টাফ কোয়ার্টারের একটি বাসায় বিষাক্ত কালনাগিনী সাপ দেখা যাওয়ায় তীব্র আতঙ্ক ছড়ায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন সাপটি উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করে। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দেড় দশকে তারা লোকালয় থেকে প্রায় হাজারেরও বেশি অজগর ও কিং কোবরাসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে। বন উজাড় না থামলে এই প্রাণীরা মানুষের ঘরের ভেতর ঢুকে পড়বে এমনটাই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। পরিবেশবাদীদের মতে, সিলেটের রাতারগুল, লাউয়াছড়া বা জাফলংয়ের বনাঞ্চল শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়; এটি এই অঞ্চলের জলবায়ু নিয়ন্ত্রক। যেভাবে মাটি কেটে, ভরাট করে ভূমিরূপ পরিবর্তন করা হচ্ছে, তাতে আগামী কয়েক বছরে সিলেট অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাবে এবং খরা ও আকস্মিক বন্যার প্রকোপ বাড়বে। সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জানান, তীব্র লোকবল সংকটের কারণে বিশাল বনাঞ্চল সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে শীর্ষ দখলদারদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং উদ্ধারকৃত জমিতে দ্রুত বনায়নের মাধ্যমে পুনর্দখল ঠেকানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। অনুসন্ধানের শেষ কথা হলো, কাগজে-কলমে উচ্ছেদ আর বাস্তবে পুনর্দখলের এই চোর-পুলিশ খেলা বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ডিজিটাল ম্যাপের মাধ্যমে বনের সীমানা নির্ধারণ, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দুই দশকের পুরোনো ভূমি মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে শীর্ষ দখলদারদের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানই কেবল পারে সিলেটের এই বিপন্ন প্রকৃতিকে রক্ষা করতে। অন্যথায়, প্রকৃতির এই স্বর্গরাজ্য অচিরেই কেবল নথিপত্রের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।

Share this news as a Photo Card

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরো কিছু জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2018 dainikbanglasangbad.com
Design & Development By Hostitbd.Com
10 June 2026

সিলেটে বন ও চা-বাগানের ৫৮ হাজার একর ভুমি জবর দখল

Dainik Bangla Sangbad.Com