
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জ সীমান্তের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী যাদুকাটা নদী এখন একদল প্রভাবশালী বালুখেকোর সীমাহীন লোভের বলী। শুষ্ক মৌসুমে যে নদীর স্বচ্ছ নীল জলরাশি পর্যটকদের মুগ্ধ করত, বর্ষা নামার আগেই সেই নদী এখন রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপে। গত মাত্র দেড় মাসে নদীর অন্তত তিন কিলোমিটার পাড় সম্পূর্ণ গিলে খেয়েছে অবৈধ ড্রেজার, যা স্থানীয়ভাবে ‘বোমা মেশিন’ নামে পরিচিত। রাতের অন্ধকারে শতাধিক ড্রেজার দিয়ে নির্বিচারে বালু তোলার ফলে মাত্র ৩৭ মিটার প্রস্থের নদীটি কোনো কোনো স্থানে কয়েক কিলোমিটার চওড়া হয়ে গেছে। এর ফলে নদীর তলদেশের জীববৈচিত্র্য যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে শত শত পরিবারের বসতভিটা ও ফসলি জমি।নজিরবিহীন এই বালু লুটের মহোৎসবে এবার এক অভিনব সমীকরণ দেখা গেছে স্থানীয় রাজনীতিতে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও যাদুকাটার বালু লুটে একাট্টা হয়েছেন দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের স্থানীয় শীর্ষ নেতারা। অতীতে যে বালুমহালের ইজারা মূল্য ছিল মাত্র ৩২ কোটি টাকা, তা এবার এই দুই দলের আট নেতা মিলে সমঝোতার ভিত্তিতে ১০৬ কোটি টাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবাধে বোমা মেশিন চালাতে তারা পুরো এলাকার প্রশাসন ও স্থানীয়দের মুখ বন্ধ করে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ নামে দুটি বালুমহাল ভাগ করে ইজারা দেয়। এর মধ্যে চালিয়াঘাট মৌজার প্রায় ৯০ একর আয়তনের যাদুকাটা-১ মহালটি ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ সাড়ে ৩৭ কোটি টাকায় ইজারা পান মেসার্স তাহিন স্টোন ক্রাশারের মালিক ও স্থানীয় বিএনপি নেতা নাছির মিয়া। অন্যদিকে, পুরান লাউড় ও চালিয়াঘাট মৌজার ২২ একরের বেশি আয়তনের যাদুকাটা-২ মহালটি ভ্যাটসহ পৌনে ৬৯ কোটি টাকায় ইজারা নেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি শাহ রুবেল আহমেদ। তবে এই দুই নেতার নামে ইজারা হলেও পর্দার আড়ালে বড় অঙ্কের শেয়ার রয়েছে দুই দলের একঝাঁক নেতার। এই সিন্ডিকেটে ২১ শতাংশ শেয়ার নিয়ে সবচেয়ে বড় অংশীদার তাহিরপুরের আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেন। এছাড়া সাবেক ধানের শীষের প্রার্থী আনিসুল হকের ছোট ভাই আনোয়ারুল হক সাড়ে ১৯ শতাংশ, আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ী মোস্তাক সাড়ে ১৬ শতাংশ, বর্তমান সংসদ সদস্যের সমর্থক নাছির উদ্দিন ১২ শতাংশ, জেলা ছাত্রলীগ নেতা শাহ রুবেল ১১ শতাংশ, তাহিরপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা জুনাব আলী সাড়ে আট শতাংশ, বিএনপি নেতা খসরু সাড়ে ছয় শতাংশ এবং আনোয়ারুল হকের ভগিনী পতি নাঈম পাঁচ শতাংশ শেয়ারের মালিক। পুরো সমঝোতা প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করেন ছাত্রলীগ নেতা শাহ রুবেল, যিনি আবার জেলা বিএনপির প্রভাবশালী শীর্ষ নেতাদের বিনা পুঁজিতে মুনাফা পাইয়ে দিয়ে তাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিতি পেয়েছেন।এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের পর ইজারার মেয়াদ ধরে রাখতে আইনি মারপ্যাঁচে জড়ায় এই সিন্ডিকেট। জেলা প্রশাসন আগামী ১৪৩৩ বা নতুন বাংলা সনের জন্য ইজারার দরপত্র আহ্বান করলে, বর্তমান ইজারাদাররা “দেরিতে দখল পাওয়ার” অজুহাতে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। আদালত নতুন দরপত্রের ওপর স্থগিতাদেশ দিলে পুরোনো সিন্ডিকেটই নদীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে দেয়। আইনি এই জটিলতা ও ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে যথাসময়ে আপিল না করার সুযোগটিকে কাজে লাগিয়েই গত দেড় মাসে নদীর পাড় কেটে সাবাড় করার এই মহোৎসব শুরু হয়।নদী ভাঙনের এই ভয়াবহতা এবং স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের নজিরবিহীন নীরবতায় চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান কামরুল। স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে তিনি গত ২৫ জুন সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। দুষ্কৃতকারীদের কালো থাবা থেকে পর্যটন এলাকা এবং যাদুকাটার দুই তীর রক্ষা করতে তিনি এলাকায় জরুরিভিত্তিতে কোস্ট গার্ড মোতায়েনের জোরালো দাবি জানান।এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও আটক করা হলেও এই চক্রের তৎপরতা থামানো যাচ্ছে না, কারণ তারা মূলত রাতের অন্ধকারে ড্রেজার চালায়। তবে এবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে একটি বড় ধরনের যৌথ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে এবং এর জন্য ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে বিশেষ বাজেট চাওয়া হয়েছে।সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান অভিযুক্ত ইজারাদার নাছির মিয়ার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে সংযোগটি কেটে দেন। অন্যদিকে অপর ইজারাদার ছাত্রলীগ নেতা শাহ রুবেলের মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, অবিলম্বে যদি এই অবৈধ বোমা মেশিনের ব্যবহার এবং নদীর পাড় কাটা বন্ধ না করা হয়, তবে অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে এই অঞ্চলের প্রাণ যাদুকাটা নদী।
Leave a Reply