
আব্দুল হালিম সাগর: সিলেটের পুণ্যভূমি ও আধ্যাত্মিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দু হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার শরিফকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক বিশাল লুটেরা সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। বিগত সরকারের রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসনের একাংশের মদদ এবং ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে এই পবিত্র স্থানের শত কোটি টাকার সম্পদ ও ভক্তদের দানের টাকা হরিলুট করেছে দরগাহ গেইটের কথিত ঠিকাদার সামুন মাহমুদ খান ও তার সহযোগীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে একের পর এক গোপন চ্যাট স্ক্রিনশট, ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকার জমির আমমোক্তারনামা দলিল এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি ফাঁস হওয়ার পর সিলেট জুড়ে এখন তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় চলছে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৬৬৩ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে মাজার এবং এর ভক্তদের কল্যাণের জন্য প্রথম ৭৮.২ একর করমুক্ত ভূমি দান করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে ভক্তদের দেওয়া দান ও সংযুক্তি মিলিয়ে মাজারের মোট জমির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১৬.৮ একর। আইনগতভাবে এই বিপুল পরিমাণ জমি হযরত শাহজালাল (রা.) মাজার ওয়েলফেয়ার এস্টেটের নামে নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তি হলেও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন জরিপ ও স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, এই ঐতিহাসিক ভূমির সিংহভাগই এখন মাজার কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে নেই। আদি সীমানার ১১৬ একরেরও বেশি জমির মধ্যে বর্তমানে মাত্র কয়েক একর জমি অবশিষ্ট রয়েছে মাজারের সীমানার ভেতরে। বাকি প্রায় ৮০ থেকে ৯০ একরেরও বেশি মূল ওয়াকফ ভূমি বিভিন্ন জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে গেছে। এই ভূমি গ্রাস এবং মাজারের অভ্যন্তরীণ সমস্ত প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১নং ওয়ার্ডের দরগাহ গেইট এলাকার বাসিন্দা মরহুম আলী মাহমুদ খানের ছেলে সামুন মাহমুদ খান। মূলবাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলায় হলেও মাজারের একেবারে প্রবেশদ্বার সংলগ্ন কৌশলগত স্থানে এখন তার পৈতৃক বাড়ি। হওয়ার সুবাদে তিনি মাজারের উপর অলিখিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নাম ভাঙিয়ে এবং তার সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছবি প্রদর্শন করে সামুন সিলেটে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে ছিলেন। দরগাহ গেইটের এই বাড়িটিকেই তিনি রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে গোপন বৈঠকের প্রধান আস্তানা এবং অপকর্মের ব্লুপ্রিন্ট তৈরির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে সখ্যের ভীতি প্রদর্শন করে তিনি মাজারের মূল কমিটি ও খাদেমদের এক প্রকার জিম্মি করে ফেলেছিলেন। মাজারের জমি গ্রাসের ক্ষেত্রে সামুন সিন্ডিকেট অত্যন্ত চতুর রাজনৈতিক ও চাপ প্রয়োগ করে মাজারের মালিকানাধীন দরগাহ গেইট এবং এর আশপাশের অত্যন্ত মূল্যবান বাণিজ্যিক জমি ও দোকানপাট ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে নিজেদের নামে কিংবা বেনামে দীর্ঘমেয়াদি লিজ লিখিয়ে নিত। পরবর্তীতে মাজারের জমিতে গড়ে ওঠা এসব দোকান, হোটেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে আদায় হওয়া লাখ লাখ টাকা ভাড়া সরাসরি সামুনের পকেটে যেত এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই ভাড়ার কোনো অংশই মাজারের মূল তহবিলে জমা হতো না। এই সিন্ডিকেটের দাপটে সাহেব বাজার (রা.) মৌজায় অবস্থিত জে.এল নং-৭১ এর অধীনস্থ বিপুল পরিমাণ মূল্যবান জমিও হাতছাড়া হয়। গত ২০/১০/২০২৩ তারিখে সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সম্পাদিত ১৫৯৬৬ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত আমমোক্তারনামা দলিলের মাধ্যমে তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা মূল্যের জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন সামুন, যার বর্তমান বাজারমূল্য আরও কয়েক গুণ বেশি। এর চেয়েও বড় আঘাত হানা হতো দেশ-বিদেশ থেকে আসা লাখ লাখ আশেকান ও ভক্তদের পবিত্র দানের ওপর। মাজারের সিন্দুক বা দানবাক্স এবং ভক্তদের পবিত্র অনুদানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু রাখা হয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ এবং ফেসবুকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর মাজারের পবিত্র সিন্দুকে যে কোটি কোটি টাকা, স্বর্ণালঙ্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রা জমা হতো, তা গণনার সময় প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে সামুন সিন্ডিকেটের নির্দিষ্ট বা বিশ্বস্ত লোকজন উপস্থিত থাকত। ক্ষমতার অপব্যবহার করে টাকা গণনার আগেই একটি বিশাল অংশ বস্তাবন্দী করে পেছনের দরজা দিয়ে সরিয়ে ফেলা হতো। এছাড়া মাজারের পবিত্রতা রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা এবং বিভিন্ন সংস্কার কাজের নামে প্রতি বছর সরকার ও বিশেষ তহবিল থেকে যে অনুদান আসত, তা নিজের ভুঁইফোড় ঠিকাদারি লাইসেন্সের মাধ্যমে কোনো কাজ না করেই বা নামমাত্র কাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ভুয়া ভাউচার পাসের মাধ্যমে সামুন নিজেই হাতিয়ে নিতেন। সামুনের এই ক্ষমতার দাপটের সামনে মাজারের ঐতিহ্যবাহী খাদেম পরিবারগুলো একপ্রকার অসহায় ছিল বলে সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাজারের শৃঙ্খলা রক্ষা ও সংস্কার নিয়ে খাদেম পরিবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মুখ খুলছেন। মাজারের বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও ওরস মোবারক উদযাপনের সময় খাদেম পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে কথা বলতেন খাদেম সাজু আহমেদ খান বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে জানান যে, মাজারের পবিত্রতা এবং ঐতিহ্য রক্ষা করা সকলের দায়িত্ব। এদিকে মাজারের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সিন্দুকের টাকা গণনা সংক্রান্ত সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সময় খাদেম নজরুল ইসলাম খান খাদেমদের পক্ষ থেকে মতামত প্রকাশ করে বলেন যে, মাজারের তহবিলে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা আসা উচিত এবং কোনো প্রকার বহিরাগত সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপ মাজারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। তবে গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই কথিত ঠিকাদার ও মাজারের টাকা লুটের মূল হোতা সামুন মাহমুদ খান ও খাদেম নামের অনেক লুটেরাজ এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার একের পর এক অপকর্মের দলিল, রাষ্ট্রের একাধিক ভিআইপির সাথে চ্যাট স্ক্রিনশট এবং বিলাসবহুল জীবন যাপনের ছবি ফাঁস হতে থাকে। সিলেটের সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে এই “মাজারখেকো” সামুনের দরগাহ গেইটের বাড়িসহ সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং মাজারের তহবিল লুটসহ ওয়াকফ জমি গ্রাসের পেছনে জড়িতদের চিহ্নিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।মাজারের এই দীর্ঘদিনের আর্থিক অস্বচ্ছতা ও লুটপাট বন্ধে সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে বড় ধরনের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যদিও ৭০০ বছরের ইতিহাস ভেঙে মাজারের দানবাক্স এখন জেলা প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে প্রকাশ্যে গণনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সার্বিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিশেষ তদারকি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। দখল হওয়া বিপুল পরিমাণ জমি উদ্ধারের বিষয়ে আইনগতভাবে হযরত শাহজালাল (রা.) মাজারের এই জমিগুলো ‘ওয়াকফ’ সম্পত্তি হওয়ায় তা চিরকাল ওয়াকফ হিসেবেই থাকবে এবং অন্য কারো নামে এর মালিকানা আইনত বৈধ নয়।
হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক মাসের মধ্যে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি যৌক্তিক কাঠামো নির্ধারণ করবে কমিটি। সম্প্রতি সিলেট সার্কিট হাউসে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সম্প্রতি শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে তালা দেওয়াকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দরগাহর উন্নয়ন এবং দানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রীকে প্রধান করে গঠিত কমিটির সদস্যরা হলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের শামীম, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. মো: জিল্লুর রহমান, সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী, মাজারের মোতোয়াল্লি পরিবারের দুজন সদস্য এবং মাজার মাদ্রাসা ও মসজিদের দুজন প্রতিনিধি। কমিটির সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন সিলেটের জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) পিংকি সাহা। যেহেতু বর্তমান প্রশাসনের উদ্যোগে দানবাক্স গণনায় স্বচ্ছতা আনা সম্ভব হয়েছে, তাই সচেতন মহলের ধারণা যদি দুর্নীতি দমন কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ওয়াকফ প্রশাসন যৌথভাবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে মাজারের আদি সীমানার সিএস ও আরএস রেকর্ড খতিয়ে দেখে, তবে লিজের নামে বা অবৈধ দখলে থাকা জমিগুলো উদ্ধার করা এ জনমেই সম্ভব।
Leave a Reply