
বিশেষ প্রতিনিধি: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সারাদেশে পরিবর্তনের হওয়া লাগলেও সিলেটের সীমান্তঘেঁষা কৌশলগত এলাকা তামাবিল স্থলবন্দর ও জাফলংয়ে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। ক্ষমতার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে কেবল অপরাধ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ হাতবদল হয়েছে, কিন্তু বন্ধ হয়নি রাজস্ব হরিলুট, চোরাচালান, চাঁদাবাজি ও পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসব। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট শীর্ষ চোরাকারবারি ও মানি মেকারদের সাথে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার অনৈতিক আঁতাতের ফলে তামাবিল ও জাফলং এখন অপরাধীদের এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অথচ দীর্ঘদিন নিপিড়ন আর মামলা-হামলার স্বীকার বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মীরা মানবেতর জীবন যাবন করছেন। আর লাখো শ্রমিক কোয়ারী বন্দ থাকায় খেয়ে না খেয়ে দিনপাত করছেন। আর শাহপরাণ সিন্ডিকেট নিজেদের আখেঁর গুছিয়ে নিয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি, অবৈধ পণ্য পারাপার, ভারতীয় শাড়ি-লেহেঙ্গার অননুমোদিত চালান খালাস এবং দিনে-দুপুরে কোটি কোটি টাকার পাথর লুটপাটের পেছনে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ১৫ সদস্যের বহুমুখী মাফিয়া চক্র। আর এই বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্যের পেছনে রাজনৈতিক মূল ‘শেল্টারদাতা’ হিসেবে উঠে এসেছে সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক এবং সিলেট জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম শাহপরানের নাম। যদিও তার এসব কান্ডে তাকে বিএনপি থেকে তাকে বহিস্কার করা হয়েছিলো, শেষ পর্যন্ত তার বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় বিএনপি। তামাবিল স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা একজোট হয়ে কাজ করছে। অনুসন্ধানে যে ১৫ সদস্যের সংঘবদ্ধ চক্রের নাম উঠে এসেছে, তাদের প্রধান নেতৃত্বে রয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম শাহপরান। চতুর রাজনৈতিক পরিচয় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি এই চক্রের মূল পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রয়দাতার ভূমিকা পালন করছেন। তার পাশাপাশি ঢাকাইয়া তথাকথিত ব্যবসায়ী ‘ডেভিল দুর্জয়’ আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী হয়েও বর্তমানে সিলেটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে অবস্থান করে তামাবিলে এই অবৈধ কাস্টমস ফাঁকি ও চোরাচালানের প্রধান মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করছেন। স্থানীয়ভাবে ‘বড় ব্যবসায়ী’ দাবিদার ‘রাসেল’ নামের এক ব্যক্তি নলজুড়ী, খাঁশি হাওর ও সোনাটিলা এলাকার সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধের নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই সিন্ডিকেটে জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ফারুক, ২নং জৈন্তাপুর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ ফখরুল ইসলাম, প্রশাসনিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তামাবিল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) আবু রায়হান চৌধুরীর নাম উঠে এসেছে। এছাড়া চক্রটিতে আরও অন্তত ছয়জন স্থানীয় চিহ্নিত লাইনম্যান, ভুয়া সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি ও পাহারাদার রয়েছে, যারা মাঠপর্যায়ে সরাসরি ট্রাকের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির টাকা আদায় করে থাকে। তামাবিল স্থলবন্দরের সবচেয়ে ভয়াবহ অনিয়মটি ঘটছে কাস্টমস শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার ক্ষেত্রে। কোনো ধরনের কাস্টমস এন্ট্রি এবং শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই সুকৌশলে বন্দর পার করে দেওয়া হয়েছে অন্তত ১৪টি পণ্যবাহী বিশালাকার ট্রাক ও কনটেইনার। প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী প্রতি চালানে সরকারের প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা করে কেবল এই ১৪টি গাড়ি থেকেই মোট ১৬ কোটি ১০ লাখ টাকার বেশি সরাসরি কাস্টমস রাজস্ব আত্মসাৎ করা হয়েছে। ভারত থেকে আসা ৩০ টনের অধিক মালামাল এবং শাড়ি-লেহেঙ্গাসহ বিলাসবহুল পণ্য কোনো প্রকার কাস্টম ট্যাক্স ছাড়াই নামিয়ে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অপেক্ষমাণ বাংলাদেশি ট্রাকে লোড করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কাস্টমস ফাঁকির পাশাপাশি এলসি পাথর পরিবহনেও চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। বন্দর থেকে প্রতিদিন বের হওয়া প্রায় ৭০০ পাথরবাহী ট্রাক থেকে ৪৫০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করছে এই রাজনৈতিক ক্যাডাররা, যার মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা অবৈধভাবে এই চক্রের পকেটে চলে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সিলেট-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদের ঘনিষ্ঠ অর্থ জোগানদাতা এবং একাধিক শীর্ষ আওয়ামী ব্যবসায়ী চরম দিশেহারা হয়ে পড়লে তাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন রফিকুল ইসলাম শাহপরান। স্থানীয় ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাতে সিলেটের এক গোপন স্থানে পলাতক আওয়ামী লুটেরা ও চোরাচালান সিন্ডিকেটের সাথে শাহপরানের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে লুটেরাদের নিরাপত্তা দেওয়া, রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান এবং মামলা থেকে বাঁচানোর আশ্বাসে নগদ ২ কোটি টাকা আদায় করেন তিনি। এই বিপুল অর্থের বিনিময়ে জাফলং পাথর কোয়ারি, সোনাটিলা এলাকা এবং তামাবিল স্থলবন্দরের সমুদয় অবৈধ চাঁদাবাজি ও চোরাচালান চক্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ শাহপরান নিজের হেফাজতে নেন এবং বিগত ১৫ বছর ধরে সাধারণ ব্যবসায়ীদের রক্ত চুষে খাওয়া চিহ্নিত চক্রটিকে পুনর্বাসিত করেন। সরকার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাময়িক স্থবিরতার সুযোগে সবচেয়ে মারাত্মক আঘাতটি আসে সিলেটের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র জাফলংয়ে। জাফলং জিরো পয়েন্ট এবং পরিবেশ-প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন সংরক্ষিত এলাকা থেকে রাতারাতি সিসি ক্যামেরা বিকল করে শুরু হয় অবাধে পাথর ও বালু উত্তোলন। এতে প্রায় ১ কোটি ঘনফুট পাথর ও বিপুল পরিমাণ বালু লুট হয়ে যায়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসন পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করে, যার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় রফিকুল ইসলাম শাহপরানসহ ১১৪ জনকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়। উক্ত মামলা তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছে পুলিশ। সেই মামলায় শাহপরাণ কে ২নং অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে, জাফলংয়ের কোটি কোটি টাকার সম্পদ লুটের ঘটনায় প্রশাসনিক ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নেপথ্য ইন্ধনে মূল ভূমিকা ছিল শাহপরানের। শাহপরানের এই চরম অনৈতিক ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গকারী কর্মকাণ্ডের তথ্যপ্রমাণ উঠে আসার পর কেন্দ্রীয় বিএনপি দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বিএনপির কেন্দ্রীয় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক পত্রে শাহপরানের সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদকের পদ স্থগিত করা হয়েছিলো। পদ ফিরে পাবার পর শাহপরান, ও তার সিন্ডিকেটের সিন্ডিকেটের সদস্যরা এখন তামাবিলে সক্রিয় রয়েছে।অন্যদিকে রাসেলের একক আধিপত্যে সোনাটিলা ও খাঁশি হাওর সীমান্ত এলাকা দিয়ে মানবপাচার, বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মাদক চোরাচালান ও ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া পণ্যের বাজার গড়ে উঠেছে, যা বন্দরের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক পরিবেশকে সম্পূর্ণ জিম্মি করে ফেলেছে। এসব গুরুতর অনিয়ম ও কোটি কোটি টাকার লুটপাটের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত মো. রফিকুল ইসলাম শাহপরান, ‘ডেভিল দুর্জয়’ এবং ‘রাসেল’-এর ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি। তামাবিল স্থলবন্দরের অভিযুক্ত দুই সহকারী পরিচালক অনিয়মের কথা অস্বীকার করলেও স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সীমান্ত সুরক্ষা ও রাজস্ব ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তারা অবিলম্বে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ, বিজিবি ও যৌথ বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন, যাতে এই মাফিয়া চক্রকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনি আওতায় আনা হয়।
Leave a Reply