1. halimshagor2011@gmail.com : bangla sangbad : bangla sangbad
  2. admin@dainikbanglasangbad.com : H@dainikbS :
মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৭ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :
‘পরকীয়া’ নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে সিলেটে ব্যবসায়ী খুন! বেপরোয়া ক্রেনের চাপায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীর মৃত্যু, ক্রেনচালক গ্রেপ্তার সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক হলেন বদরুজ্জামান সেলিম গোয়াইনঘাটে নদী ও চা-বাগান গিলছে ‘কামরুল-খায়রুল-জুবের-দুলাল’ সিন্ডিকেট সিলেটের তামাবিল ও জাফলংয়ে আ.লীগ বিএনপি লুটপাট সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে শাহপরাণ সিলেটে আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের মোড় কোন দিকে যাচ্ছে ? সারাদেশে নামসর্বস্ব ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যুর ফাঁদ ‘অপরাধের বিরুদ্ধে এসএমপির ‘জিরো টলারেন্স’ সিলেটে একের পর এক চিরুনি অভিযান সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীর বালু সিন্ডিকেটের কাছে প্রশাসনের মতো অসহায় স্থানীয় এমপি

‘গোয়াইনঘাটে সর্বদলীয় বালু সিন্ডিকেটের টাকার কাছে জিম্মি প্রশাসন”
শর্তভঙ্গের পাহাড়, তাও কেন বহাল ইজারা?

  • আপটেড সময় : মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬
  • ১২৭ বার পঠিত

# ২৬ কোটির লিজের আড়ালে হাজার কোটির হরিলুট। # ড্রেজারের থাবায় মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে গোয়াইনঘাট! # বালু খেকোদের উল্লাস, নদীপাড়ে কান্নার রোল। # লিজ বাতিলের দাবীতে গোয়াইনঘাটে গণ-বিস্ফোরণ।

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন :
সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলা জুড়ে এখন চলছে পরিবেশ ও জনপদ ধ্বংসের এক ভয়াল ও নিষ্ঠুর ক্রাইম সিন্ডিকেট। নদীর পাড়ের মানুষের বুকফাটা কান্না, ভাঙনের গ্রাসে একের পর এক বিলীন হওয়া ভিটেমাটি, ঐতিহাসিক মসজিদ, খেলার মাঠ, কবরস্থান আর সরকারি রাস্তাঘাট সব মিলিয়ে এক বিপর্যস্ত ও রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো এলাকা। সরকারি নিয়মনীতিকে স্রেফ কাগজের টুকরো বানিয়ে পিয়াইন নদী, গোয়াইন নদী ও ডাউকি অববাহিকাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে একটি শক্তিশালী সর্বদলীয় বালু সিন্ডিকেট। ইজারার শর্তের তোয়াক্কা না করে দিন-রাত চলছে বালু ও পাথর লুটের এক অভূতপূর্ব মহোৎসব। উচ্চ আদালতের রিট পিটিশন ও রুল জারি থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন, কতিপয় সাংবাদিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের এক শক্তিশালী ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ার কারণে পুরো জনপদ এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি এখন এতটাই বেগতিক যে, একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও নদীপাড়ের মানুষের বিশাল গণ-মানববন্ধনে পুরো গোয়াইনঘাট উত্তাল হয়ে উঠেছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্বের আইনি আবরণ, যার আড়ালে চলছে দৈনিক প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি টাকার পরিবেশ নিধন ও প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আর্থিক সুবিধা গ্রহণের উৎসব। চলতি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের জন্য সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও গোয়াইনঘাট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক ঐতিহ্যবাহী হাজীপুর-আহারকান্দি অর্থাৎ নবসৃষ্ট হাজীপুর বালুমহালটি আনুষ্ঠানিক ভাবে নতুন ইজারাদার মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মোঃ আবদুল্লাহ আল মামুন (হাফিজ আব্দুল্লাহ)-এর নিকট হস্তান্তর করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের ৩০শে চৈত্র পর্যন্ত মেয়াদের জন্য এই বালুমহালের মোট ইজারামূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা। এর সাথে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ ৩ কোটি ১২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা এবং ১০ শতাংশ আয়কর বাবদ ২ কোটি ৪ লক্ষ ২০ হাজার টাকাসহ সর্বমোট ২৬ কোটি ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। সরকারি রাজস্ব আদায়ের পর ডিসি আর নম্বর ৩০০৬১/১৭ মূলে ইজারাদারের অনুকূলে এই কার্য্যাদেশ জারি করা হয়। আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর কালে গোয়াইনঘাট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোঃ জীবন মোনরেস উপস্থিত থেকে দক্ষিণ প্রতাপপুর, লাটি, লঙ্গু এবং কালিঞ্জীরী মৌজার সর্বমোট ৮৮.৭৮ একর নদী ও বালুচর এলাকার সীমানা ও দখল বুঝিয়ে দেন। কাগজে-কলমে মাত্র ৮৮.৭৮ একর এলাকা ইজারা দেওয়া হলেও, গত ১৬ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী নতুন ইজারা গ্রহীতাকে ইজারাকৃত অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার সময় কোনো সীমানা নির্ধারণ বা কোনো লাল পতাকা না টাঙিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। আর এই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে পুঁজি করে আবদুল্লাহ আল মামুন এক অভিনব চাল চলেন। নিজের দখলদারিত্বকে নিশ্চিদ্র করতে তিনি স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ অন্তত ৪৩ জন বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রদল নেতাকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অংশীদার করে গঠন করেন এক নজিরবিহীন সর্বদলীয় বালু সিন্ডিকেট। ইজারার মূল চালিকা শক্তিরা রাজনৈতিক খোলস বদলে এই সিন্ডিকেটের ছায়াতলে এসে সুনির্দিষ্ট ৮৮.৭৮ একরের সীমানা ছাড়িয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাকে বালু লুটের অভয়ারণ্য বানিয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইজারার সীমানা আইনত হাজীপুর-আহারকান্দিতে সীমাবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে পিয়াইন নদী, গোয়াইন নদী ও ডাউকি অববাহিকার প্রায় ১১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবাধে বালু হরিলুট চলছে। ইজারা এলাকার বাইরে গিয়ে পশ্চিম জাফলং, গোয়াইনঘাট সদর ও মধ্য জাফলং ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্টে দিবারাত্রি কয়েক হাজার অবৈধ ড্রেজার ও দানবযন্ত্র বসিয়ে বালু লুটপাট করা হচ্ছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রধান স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে হাজীপুর, উত্তর প্রতাপপুর, দক্ষিণ প্রতাপপুর, লুনি, লাটি, কইনাজঙ্গল, আহারকান্দি, লেঙ্গুড়া, লুনি ফুটবল মাঠ সংলগ্ন এলাকা, রাধানগর, আলীরগাঁও, পাঁচহাতি খেয়া, আমবাড়ি, রাঙাপানি এবং পিয়াইন নদীর তীব্র ভাঙ্গন কবলিত আনন্দ খাল এলাকা। এছাড়াও জাফলং সেতু সংলগ্ন এলাকা, পঙ্গুশা নদী, বাহাড় নদী, লাটি নদী এলাকা, হাতীবুড়, ধুপী এবং বালুুমহাল এলাকায় নিষিদ্ধ যন্ত্র বসিয়ে দিবারাত্রি বালু লুটের মহোৎসব চালানো হচ্ছে। ইজারার চুক্তিপত্রে স্পষ্ট ও কঠোর কিছু আইনি শর্ত আরোপ করা হয়েছিল, যা অমান্য করলে ইজারা বাতিল করা জেলা প্রশাসনের জন্য বাধ্যতামুলক। চুক্তিপত্রের প্রধান শর্ত অনুযায়ী বালু উত্তোলনে পাম্প বা ড্রেজিং বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে সনাতন বা ম্যানুয়াল পদ্ধতির তোয়াক্কা না করে দিন-রাত নদী ও ফসলি জমি খুঁড়ে বালু তোলা হচ্ছে নিষিদ্ধ বোমা মেশিন, বালুভর্তি এক্সাভেটর, ফেলুডার, পেলোডার এবং ড্রেজার দিয়ে। শর্ত অনুযায়ী শুধুমাত্র দিনের বেলা সাধারণ পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করার নিয়ম থাকলেও আইন অমান্য করে ২৪ ঘণ্টা সমানে কাজ চলছে। এছাড়া ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তাঘাট, ফেরিঘাট, হাটবাজার, চা-বাগান, নদীর বাঁধ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনার সন্নিকটবর্তী স্থান থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ হলেও জাফলং সেতুসহ বিভিন্ন স্থাপনা, বাঁধ এবং গ্রামীণ রাস্তার তলদেশ থেকে বালু তোলায় এগুলো ধসের মুখে পড়েছে। শর্ত অনুযায়ী বালু উত্তোলন করার পর পানির সর্বোচ্চ গভীরতা ১২ ফুটের বেশি হতে পারবে না এবং পাহাড় ধস, ভূমি ধস অথবা নদী বা খালের পানির স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন হয় এমন কোনো স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা যাবে না। তবে বোমা মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহারের ফলে আনন্দ খাল এলাকা সহ বিভিন্ন নদীর তলদেশে গভীর গর্ত তৈরি হয়ে পানির গভীরতা বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করেছে, যার ফলে নদীর পাড়ের তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বা নদীর বাঁধের কোনো ক্ষতি সাধন করা যাবে না এবং বালুমহালের নির্ধারিত আয়তন হ্রাস-বৃদ্ধি বা জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না শর্ত থাকলেও এই সিন্ডিকেট নদীর পারের ফসলি জমি ও মাটিকেটে নদীগর্ভে বিলীন করে দিচ্ছে। রয্যালিটির নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন ২০০ ফুটের প্রতিটি নৌকা ও ট্রাক থেকে ১ হাজার টাকা করে অবৈধ রয়্যালটির নামে চাঁদা তোলা হচ্ছে। লিজের কাগজপত্রে রয়্যালটি নামের চাঁদা আদায়ের কথা উল্লেখ না থাকলেও প্রকাশ্যে সেখানে প্রতিফুট বালু থেকে ১০ থেকে ১২ টাকা করে রয়্যারিটি আদায় করছে চাঁদাবাজ গ্রুপ। বালু উত্তোলন করে প্রতিটি নৌকা থেকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ইজারাদার গ্রুপ। এরকম বেশ কয়েকটি রসিদ ও কাগজ আমাদের হাতে এসেছে, যেখানে প্রতিটি কাগজে নৌকা প্রতি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আদায়ের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
সবচেয়ে বড় আইনি লঙ্ঘনটি ঘটছে সাবলিজের ক্ষেত্রে, যেখানে শর্তে বলা আছে, ইজারা গৃহীতা কোনো অবস্থাতেই বালুমহালের কোনো অংশ কারো নিকট সাবলিজ প্রদান করতে পারবেন না। সেখানে সম্পূর্ণ বে-আইনিভাবে মহালের বিভিন্ন অংশ উপ-ইজারা বা সাবলিজ দিয়ে লুটপাটের বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। এই প্রধান শর্তগুলোর প্রতিটি শতভাগ লঙ্ঘিত হওয়ার কারণে ইজারাদার আবদুল্লাহ আল মামুনের লিজ অবিলম্বে বাতিল করা জেলা প্রশাসনের জন্য আইনগত ভাবে বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। কিন্তু এতসব সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও গণ-আর্তনাদের পরও কেন জেলা প্রশাসন এই ইজারা বাতিল করার বিষয়ে রহস্যজনক ভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে। তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের কাছে এখন জোর দাবি উঠেছে, শর্ত লঙ্ঘনের পাহাড় জমা হওয়ার পরও কোন অদৃশ্য ইশারায় লিজ বহাল রাখা হয়েছে। তার প্রকাশ্য আইনি ব্যাখ্যা দিতে হবে। এই সর্বগ্রাসী লুণ্ঠনের ফলে দক্ষিণ প্রতাপপুর, হাজীপুর, লুনি, লেঙ্গুড়া, আনন্দ খাল ও বগলা কুঞ্জা এলাকার শত শত ঘরবাড়ি, ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, কবরস্থান ও সরকারি রাস্তাঘাট এখন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ড্রেজার দিয়ে যত্রতত্র গভীর গর্ত করায় পিয়াইন নদীর তীব্র ভাঙনে মালিকানাধীন লুনি ফুটবল মাঠসহ স্থানীয় তিনটি ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠ এখন বিলীনের অপেক্ষায়। লুনি গ্রামের অনেক বাসিন্ধারা এবং দক্ষিণ প্রতাপপুরের অনেক বাসিন্ধা জানান, তাদের বসতভিটা যেকোনো মুহূর্তে নদীতে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে হাজীপুর এলাকায় নদী ভাঙনের শিকার হয়ে নিজের শেষ সম্বল ঘরবাড়ি হারিয়ে সম্পূর্ণ সর্বস্বান্ত হয়েছেন হেলেনা বেগম ও তরিক উল্লাহর মতো সাধারণ মানুষ। লুণ্ঠনকারীদের সশস্ত্র লাঠিয়াল বাহিনীর ভয়ে সাধারণ মানুষ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছিল না। তবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় সম্প্রতি হাজীপুর, লুনি ও বগলা কুঞ্জা এলাকার নদীর তীরে ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর উদ্যোগে এক বিশাল গণ-মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। শুধু মানববন্ধনই নয়, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, ইজারাবহির্ভূত সীমানা লঙ্ঘন ও অতিরিক্ত রয়্যালটি আদায় নিয়ে গত ১০ জুন থেকে গত পর্যন্ত বালু উত্তোলন নিয়ে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষেও ঘটনা ঘটেছে। এলাকায় গ্রামবাসী ও সিন্ডিকেটের লাঠিয়াল বাহিনীর মধ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বালুভর্তি নৌকা ও ট্রাক থেকে অবৈধভাবে চাঁদা দাবি করাকে কেন্দ্র করে এই মারামারির সূত্রপাত হয় এবং সিন্ডিকেটের সশস্ত্র বাহিনী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর চড়াও হলে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। প্রতিদিন কোনো না কোনো স্পটে অবৈধ আদায়ের অর্থ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এই চরম দুর্বৃত্তির পেছনে স্থানীয় ভূমি প্রশাসন থেকে শুরু করে জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, অবহেলা ও আর্থিক লেনদেনের চিত্র উঠে এসেছে।
গোয়াইনঘাট উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও রিট পিটিশন থাকা সত্ত্বেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। লোক দেখানো হিসেবে মাঝেমধ্যে কিছু সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে কিছু মেশিন জব্দ বা পুড়িয়ে দিলেও মূল হোতা কিংবা সিন্ডিকেটের কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি আজ পর্যন্ত। কিসের ক্ষমতার বলে প্রকাশ্যে এসব চাঁদাবাজি হচ্ছে এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার কেনই বা নীরব রয়েছে এমন প্রশ্ন এখন সকল মিডিয়ায় শোভা পাচ্ছে। রতন কুমার অধিকারী নিজে দায়সারা জবাব দিচ্ছেন। তিনি লিজের জন্য দায়ী করছেন জেলা প্রশাসক ও এডিসি রেভিনিউকে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান দায়িত্বে যেখানে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল গোয়াইনঘাট থানার ওসি মনিরুজ্জামানের। সেখানে সদ্য বদলী হয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সিন্ডিকেটের প্রধান রক্ষা কবজ হিসেবে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওসি মনিরুজ্জামানকে সম্পূর্ণ ম্যানেজ করে ওসির পকেটে গেছে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা ও কয়েক কোটি টাকা চলে গেছে।
ওসি নিজে অবৈধ স্পটগুলো ঘুরে দেখতেন কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিতেন না, বরং প্রতিদিন বিকেলে লাইনম্যানের মাধ্যমে টাকা চলে যেত থানায়। এ রকম দুটি ভিডিও ফুটেজ রয়েছে আমাদের কাছে, যেখানে ওসি ঘুরে ঘুরে দেখছেন অবৈধ বালু উত্তোলন অথচ চোখের সামনে লাগানো রয়েছে ধানব যন্ত্র।
তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত ১৮ জুন ওসি মনিরুজ্জামানকে চট্টগ্রাম বিভাগে বদলি করা হয়েছে। এবং আগামী ২ জুলাই ২০২৬ তারিখের মধ্যে তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে, নতুবা ৩ জুলাই থেকে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হবে। তবে স্থানীয়দের দাবি, ওসির এই বদলি ঠেকাতে এবং তাকে বহাল রাখতে পর্দার আড়ালে ব্যাপক তৎপরতা ও আর্থিক লেনদেনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ওসিকে যাতে থানা থেকে বদলি না করা হয় অদৃশ্য পথে হাঁটছে বালু সিন্ডিকেট। তারা সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে। তাঁকে কাজে লাগিয়ে তারা ওসি মনিরুজ্জানকে যে কোন ভাবে থানায় বহাল রাখতে চায়। এই সিন্ডিকেটের কথা দাপটে মন্ত্রী শুনলেও, গোয়াইনঘাটের নদীর পারের হাজারো মানুষের আহাজারি তিনি শুনতে পাচ্ছেন না। অবৈধ বালু বন্ধে বারবার মানববন্ধন হলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পুরো উপজেলার বালু লুট ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্যকে মূলত চারটি রুটে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করছে ৪০-৫০ জনের একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী চক্র।
বালু মহাল এলাকায় পরিবেশ ধ্বংসের রাজত্ব কায়েম করেছে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) বিতর্কিত কর্মচারী আমীর উদ্দিন। এছাড়া সিন্ডিকেটকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রাখতে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের পেছনে দৈনিক খরচ করা হয় আরও ১ লক্ষ টাকা। এই মহালুটের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে নীরব রাখতে আমির উদ্দিন গংদের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে একটি বিশেষ সাংবাদিক ম্যানেজার ফান্ড, যেখানে প্রতি দিন মুখ বন্ধ রাখার ঘুষ হিসেবে ৩ লক্ষ টাকা বিতরণ করা হয় এবং উপজেলার কথিত কিছু সাংবাদিক সরাসরি এই বালু বাণিজ্যের অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বারবার লিখিত আবেদন জানিয়েছেন, এমনকি সহকারী কমিশনারের কার্যালয় থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের চিঠি দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। গত ৯ জুন ২০২৬ তারিখে হিফজুর রহমান খান নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি উত্তর প্রতাপপুর মৌজার অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর একটি আবেদন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পাঠানো হলেও জেলা প্রশাসন বা বিভাগীয় কমিশনারের পক্ষ থেকে কোনো স্থায়ী টাস্কফোর্সের অভিযান বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তীব্র সমালোচনার মুখে গোয়াইনঘাট থানার সদ্য বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে সাধারণ মানুষকে বুঝাতে চাচ্ছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের কোনো ধরণের প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি এবং আর্থিক সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করছেন, নিয়মতান্ত্রিক বদলি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তাকে চট্টগ্রাম বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং দায়িত্ব পালনকালে তিনি সর্বদা আইন শৃঙ্খলার পক্ষে কাজ করেছেন।
অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী তার অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, উপজেলা প্রশাসন অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে একের পর এক টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করেছে এবং অসংখ্য ড্রেজার ও মেশিন ধ্বংস করা হয়েছে। তবে লিজের সীমানা নির্ধারণ এবং এর আইনি শর্ত বলবৎ বা বাতিলের মূল এখতিয়ার জেলা প্রশাসক ও এডিসি রেভিনিউয়ের কার্যালয়ের হওয়ায় তাদের পক্ষ থেকে বড় কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা না আসলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে একতরফা ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এসিল্যান্ড জানান, ভূমি অফিস থেকে ইজারার সীমানা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং অবৈধ লিজ বহির্ভূত স্থানে বালু তোলার খবর পেয়ে বেশ কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে, তবে লিজের আইনি শর্ত ভঙ্গের চুড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষমতা তাদের সীমিত। পুরো বিষয়টি নিয়ে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বা এডিসি রেভিনিউয়ের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ইজারার চুক্তিপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে ড্রেজার ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই এবং যদি কোনো লিখিত অভিযোগ এবং সুনির্দিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়, তবে সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের লিজ বাতিল করতে জেলা প্রশাসন দ্বিধা করবে না।
এদিকে মাঠ পর্যায়ের চরম বাস্তবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন সাংবাদিক ও ভুক্তভোগীরা। গোয়াইনঘাটের কর্মরত স্থানীয় পেশাদার সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কতিপয় নামধারী ও কথিত সাংবাদিক সিন্ডিকেটের আর্থিক সুবিধাভোগী হওয়ায় পুরো সাংবাদিক সমাজ আজ কলঙ্কিত হচ্ছে, অথচ মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীরা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই মহালুটের চিত্র তুলে ধরছেন। নদী ভাঙনে সর্বস্বান্ত হওয়া হাজীপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, চোখের সামনে ড্রেজার দিয়ে নদী খুঁড়ে আমাদের ঘরবাড়ি, শেষ সম্বল গ্রাস করা হয়েছে, অথচ প্রশাসনকে বারবার জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। তারা আক্ষেপ করে বলেন, সরকার বদলায়, লিজের মালিক বদলায়, কিন্তু আমাদের মতো গরিবের ভিটেমাটি রক্ষা করার জন্য কোনো প্রশাসন এগিয়ে আসে না। পুরো গোয়াইনঘাট যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন ঐতিহ্যবাহী এই জনপদকে রক্ষায় এখন সরাসরি সিলেট বিভাগীয় কমিশনার এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য তথা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী জনাব আরিফুল হকের সরাসরি জোরালো হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সর্বস্বান্ত হওয়া লাখো এলাকাবাসী। এলাকার অভিভাবক হিসেবে মন্ত্রীর সরাসরি অগ্রণী ভূমিকা এখন সময়ের দাবি। নবাগত জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে এখন নদীপাড়ের মানুষের একটাই ফরিয়াদ, উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) অপসারণ করা হোক, দ্রুত বিঘ্নিত সীমানায় লাল পতাকা টাঙানো হোক এবং পরিবেশ বিনাশী বোমা ও ড্রেজার মেশিন সিন্ডিকেটকে চিরতরে উচ্ছেদ করা হোক। লিজ বাতিলের পাশাপাশি অবৈধ ড্রেজার সিন্ডিকেটের মূল হোতা আবদুল্লাহ আল মামুন, বিতর্কিত সিসিক কর্মচারী আমীর উদ্দিনসহ মাঠপর্যায়ের চাঁদাবাজ লাঠিয়াল বাহিনী এবং তাদের সহায়তাকারী দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় না আনলে এই সীমান্তবর্তী ঐতিহ্যবাহী জনপদকে মানচিত্র থেকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। স্থানীয় বগলা কুঞ্জা ও লুনি গ্রামের প্রতিবাদী সাধারণ মানুষ ও মানববন্ধনের আয়োজকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি অবিলম্বে নদীর বুকে লাল পতাকা টাঙিয়ে ড্রেজার ও বোমা মেশিন স্থায়ীভাবে বন্ধ করা না হয় এবং এই দুর্নীতিবাজ চক্রকে আইনের আওতায় এনে লিজ বাতিল করা না হয়, তবে গোয়াইনঘাটের আপামর জনতা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় আরও কঠোর ও বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিতে বাধ্য হবে।

Share this news as a Photo Card

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

আরো কিছু জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2018 dainikbanglasangbad.com
Design & Development By Hostitbd.Com
30 June 2026

শর্তভঙ্গের পাহাড়, তাও কেন বহাল ইজারা?

Dainik Bangla Sangbad.Com