
কালাম সিকদার (গোয়াইনঘাট) সিলেট প্রতিনিধি : সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের হাজিপুর বালু মহালে দীর্ঘদিনের পরিবেশ ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে অবশেষে অ্যাকশনে নেমেছে প্রশাসন। ইজারার শর্তের তোয়াক্কা না করে দিনরাত ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার মহোৎসবের পর সেখানে আকস্মিক যৌথ অভিযান পরিচালনা করেছে টাস্কফোর্স। পুলিশ ও বিজিবির সহায়তায় মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত চলা এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন গোয়াইনঘাটের নবনিযুক্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জাকারিয়া হোসেন। অভিযান চলাকালে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ২০টি নিষিদ্ধ লিস্টার মেশিন এবং নদী ও ফসলি জমি কেটে সাবাড় করার কাজে ব্যবহৃত প্রায় ১৫ লাখ টাকা মূল্যের বিশাল পাইপলাইন গুঁড়িয়ে দেয় টাস্কফোর্স। একই সাথে অবৈধভাবে বালু কাটার অপরাধে হাতেনাতে আটক করা হয় আবুল কাশেম ও তরিকুল ইসলাম নামের দুই শ্রমিককে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী পরে তাদের দুজনকে ৫০ হাজার টাকা করে মোট এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় অভিযানের সফলতা বেশ কম। অভিযানের খবর আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় কয়েকশত ড্রেজার ও লিস্টার মেশিন নিয়ে বালু দস্যুরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, তিনি মাত্র এক সপ্তাহ আগে দায়িত্ব নিয়েছেন এবং যোগদানের পর এটি তার তৃতীয় অভিযান। তিনি হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, নির্ধারিত সীমানার বাইরে এবং সনাতন পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে বালু তুললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ভেতরের খবর নিয়ে জানা যায়, চলতি বছর পশ্চিম জাফলংয়ের হাজিপুর বালু মহালটি প্রায় ২৬ কোটি টাকায় ইজারা পায় মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট কয়েকটি মৌজা থেকে শুধুমাত্র হাতে কোদাল দিয়ে বালু তোলার নিয়ম থাকলেও, বাস্তবে হাজার হাজার ড্রেজার বসিয়ে উত্তর প্রতাপপুর, লুনি ও আমবাড়ির মতো ইজারা বহির্ভূত এলাকাও গ্রাস করা হচ্ছিল। সামান্য টাকার লোভ দেখিয়ে বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে নিরীহ মানুষের ফসলি জমি ও ঘরবাড়ির তলার মাটি ধসিয়ে দেওয়ায় পুরো সমতল এলাকা এখন পিয়াইন নদীর গর্ভে বিলীন হওয়ার মুখে। ফলে সরকারের ২৬ কোটির ইজারা থেকে স্থানীয় এলাকার শতকোটি টাকার পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতি হয়ে গেছে। এদিকে পরিবেশের এই চরম বিপর্যয়ের দিনে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি নিজের দায় এড়িয়ে জানিয়েছেন যে, বালুমহাল দেখাশোনার মূল দায়িত্ব প্রশাসনের এবং পুলিশ শুধু তাদের চাওয়া অনুযায়ী ফোর্স পাঠায়। তিনি মূলত মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকেন উল্লেখ করে জানান যে, ইতিমধ্যে তিনি বদলির আবেদন করেছেন এবং তার বদলির আদেশও হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, জাফলংয়ের প্রকৃতি ও পিয়াইন নদীকে বাঁচাতে হলে শুধু এক বারের অভিযান নয়, বরং নিয়মিত কঠোর নজরদারি এবং ইজারাদারের লাইসেন্স বাতিলের মতো বড় পদক্ষেপ প্রয়োজন।
Leave a Reply