
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিতের শেষ মেয়াদে সিলেটের উন্নয়ন কাজ তদারকির দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই অসাধু প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়েন ড. মোমেন ও তাঁর স্ত্রী সেলিনা মোমেন। তাঁরা চাইনিজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি’র কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অবিশ্বাস্য নির্মাণ ব্যয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নীতকরণ প্রকল্পটি পাইয়ে দেওয়ার গোপন চুক্তি করেন। বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ নির্মাণ ব্যয় হিসেবে এই প্রকল্পের মোট বাজেট ধরা হয়েছিল প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা, যেখানে প্রতি কিলোমিটারে খরচ দেখানো হয় প্রায় ৮০ থেকে ৮১ কোটি টাকা।
নথি ও প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ঢাকায় চুক্তি স্বাক্ষরের দিনই ঘুষের পার্ট পেমেন্ট হিসেবে ১৫০ কোটি টাকা চায়না কোম্পানির কাছ থেকে গ্রহণ করেন ড. মোমেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রেখে গোপনে লেনদেন করার জন্য চা পাতার কার্টনে ভরে সরাসরি তাঁর বাসভবনে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে ঘুষের ভাগের টাকা না পেয়ে তৎকালীন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ক্ষিপ্ত হয়ে তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেন। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাও চা পাতার কার্টনে ভরে ১৫০ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের সত্যতা পায়, যার ফলে চায়না কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি থমকে যায় এবং বছরের পর বছর আটকে থাকে পুরো প্রকল্পের কাজ। পরবর্তী সময়ে চুক্তিটি রক্ষা করতে মোমেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে দফায় দফায় ধর্না দেন এবং বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী মহলে একাধিক গোপন চিঠি পাঠান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রাক্তন মন্ত্রীর সমুদয় অবৈধ উপার্জন, কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের মূল ক্যাশিয়ারের ভূমিকা পালন করতেন তাঁর স্ত্রী সেলিনা মোমেন, যাকে প্রকাশ্য এক অনুষ্ঠানে স্বয়ং সাবেক মন্ত্রী মোমেন নিজের “বস” হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। স্বামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর কুমিল্লার মেয়ে সেলিনা মোমেন সিলেটের সরকারি দপ্তর ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। সিলেট-১ আসনের টিআর, কাবিখা ও অন্যান্য উন্নয়ন কাজের বরাদ্দ পেতে ঠিকাদারদের বিলের ২৫ শতাংশ আগাম নগদ কমিশন দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছিলেন তিনি। নিজ জেলার লোক হিরন মাহমুদকে সদর উপজেলায় প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন অফিসার হিসেবে পোস্টিং দিয়ে এবং মন্ত্রীর এপিএস শফিউল আলম জুয়েল ও বিতর্কিত নেত্রী হেলেন আহমদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই কমিশন আদায় করা হতো।
শুধু উন্নয়ন প্রকল্পই নয়, স্বামীর প্রতিটি আন্তর্জাতিক সফরকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন সেলিনা মোমেন। প্রতিটি সফরে সফরসঙ্গী হিসেবে অন্য ৮ থেকে ১০ জনের নাম যুক্ত করে জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা আদায় করা হতো এবং মন্ত্রণালয়ের প্যাডে রিকোয়েষ্ট লেটার দিয়ে তাঁদের ভিসার ব্যবস্থা করা হতো। এ ছাড়া সিলেট পাসপোর্ট অফিস থেকে প্রতি মাসে ৩০ লাখ টাকার বেশি মাসোহারা, সিলেট এয়ারপোর্ট-কোম্পানীগঞ্জ রোড প্রজেক্ট ও সিটি করপোরেশনের বরাদ্দ থেকে নির্দিষ্ট কমিশন গ্রহণ করতেন তিনি। এমনকি সীমান্ত অঞ্চলের চিনি চোরাচালানের নির্দিষ্ট অংশও তাঁর কাছে পৌঁছানো হতো। স্বামীর সংসদ নির্বাচনে সাবেক জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন এবং দুর্নীতির টাকা বৈধ করার উদ্দেশ্যে ‘সেলিনা-মোমেন ফাউন্ডেশন’ গঠন করেছিলেন।
দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত শত শত কোটি টাকা ও সম্পদের পাহাড় গড়ার পর, গণঅভ্যুত্থান ও জুলাই বিপ্লবের প্রাক্কালে সেলিনা মোমেন দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। তবে তাঁদের এই ব্যক্তিগত লোভ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের খেসারত আজ দিতে হচ্ছে পুরো সিলেটবাসীকে। যে মহাসড়ক বহু আগেই চার বা ছয় লেনে উন্নীত হয়ে চলাচলের উপযোগী হওয়ার কথা ছিল, তা আজ অগণিত মানুষের মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
Leave a Reply