সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে সড়কটি এখন রূপ নিয়েছে চরম মৃত্যুফাঁদে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে গর্ত ও বেপরোয়া গতিতে প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ
আপটেড সময় :
সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
৫১
বার পঠিত
আব্দুল হালিম সাগর : ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এখন যেন এক ভয়াবহ আতঙ্ক আর মৃত্যুর মিছিলের অপর নাম। প্রতিনিয়ত ঘটে চলা মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে এই পথ, বাড়ছে স্বজনহারাদের দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় পড়ে থাকা সড়ক, বিশাল বিশাল গর্ত, টানা বর্ষার জলাবদ্ধতা এবং চালকদের সীমাহীন বেপরোয়া মনোভাব মিলিয়ে সড়কটি বর্তমানে চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মহাসড়কের অনেক স্থানে বড় বড় খানাখন্দের সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহনগুলো হেলেদুলে চলাচল করতে গিয়ে যেকোনো মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণে হারাচ্ছে। সম্প্রতি একের পর এক বড় দুর্ঘটনায় বহু মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানির পর বিষয়টি তীব্র আলোচনার জন্ম দিলেও বাস্তবে সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কার্যকর কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। সংবাদসূত্রে জানা যায়, গত রোববার হবিগঞ্জের মাধবপুর এলাকায় তেলবাহী লরি, বালুবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ত্রিপক্ষীয় সংঘর্ষে দুইজন প্রাণ হারান। এর ঠিক দুদিন আগে, গত শুক্রবার সকালে সিলেটের ওসমানীনগরে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি ভয়াবহ সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হন, যার মধ্যে ৭ জনই ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান। এর আগে গত ৩ মে দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজারে কাঁঠালবোঝাই ট্রাক ও শ্রমিক বহনকারী ডিআই ট্রাকের তীব্র সংঘর্ষে আরও ৮ জন নিহত হয়েছিলেন। কেবল এই বড় দুর্ঘটনাগুলোই নয়, মোটরসাইকেল, লেগুনা ও সিএনজি অটোরিকশার মতো ছোট যানগুলো প্রতিদিন ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে, যার অনেক খবরই অন্তরালে থেকে যায়। তথ্যমতে, গত সাত মাসে কেবল সিলেট অংশে ২৮টি দুর্ঘটনায় ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে হাইওয়ে পুলিশ ও নিসচার পরিসংখ্যান বলছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই—এই ছয় মাসে সিলেট বিভাগের মহাসড়কগুলোতে ১৮৫টি দুর্ঘটনায় ১১৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। এই মহাসড়কটিতে ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির পেছনে একাধিক সমন্বিত কারণ কাজ করছে। একদিকে সড়কের ভয়াবহ ভাঙাচোরা অবস্থা এবং বর্ষায় জমে থাকা পানি পথচারী ও চালকদের জন্য মরণফাঁদ তৈরি করেছে; অন্যদিকে যোগ হয়েছে ভৌগোলিক ও কাঠামোগত নানা জটিল ত্রুটি। বিশেষ করে তেলিবাজার, রশিদপুর, দয়ামীর ও কাশিকাপনের মতো এলাকাগুলোতে অসংখ্য অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড় রয়েছে। এ ছাড়া মহাসড়ক দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থানীয় বাজার এবং ধীরগতির ত্রুটিপূর্ণ ও মিশ্র যানবাহন চলাচলের কারণে মূল দূরপাল্লার গাড়িগুলো সার্বক্ষণিক ঝুঁকির মুখে থাকে। দীর্ঘ যাত্রার ফলে চালকদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর মানসিক চাপ, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং অনিয়ন্ত্রিত গতি এই সড়কের মোড়গুলোতে নিশ্চিত মৃত্যুর ফাঁদ তৈরি করছে। দুর্ঘটনার এমন লাগামহীন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পক্ষ থেকে সুরক্ষার নানা তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। শেরপুর হাইওয়ে থানা-পুলিশের মতে, দীর্ঘ দূরত্বের ক্লান্তি এবং চালকদের বেপরোয়া গতিই ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলোর মূল নিয়ামক। প্রস্তাবিত ৬ লেনের উন্নয়ন কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলে হয়তো পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এবং স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক নেতারা সড়ক নিরাপত্তার জন্য কেবল কাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং চালকদের মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছেন। মহাসড়কে ৮ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করা, চালক ও সহযোগীদের জন্য সরকারি উদ্যোগে নিয়মিত সচেতনতামূলক ট্রেনিংয়ের আয়োজন করা এবং মহাসড়কে সিএনজি ও লেগুনার মতো অবৈধ যান চলাচল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করার ওপর তারা তাগিদ দিয়েছেন। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, বিপজ্জনক মোড়গুলোর আধুনিকায়ন এবং চালক থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারীদের সচেতনতাই পারে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে এই রক্তক্ষয়ী মৃত্যুফাঁদ থেকে রক্ষা করতে।
Leave a Reply