
আবদুল হালিম সাগর: বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দৌড়ঝাঁপ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে সত্য, তবে সংবাদের গভীরতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও পেশাগত মর্যাদা কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। সাংবাদিকতা আজ ক্রমশ ‘কপি-পেস্ট’, অন্যের তথ্য চুরি এবং রেডিমেড প্রেস রিলিজের দাসত্বে রূপ নিচ্ছে। যেকোনো ঘটনা ঘটলেই অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজগুলোর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়—কে কী লিখল তা দ্রুত কপি করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া। লাইক, ভিউ আর সাময়িক বাণিজ্যিক স্বার্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে পেশাগত নৈতিকতা আজ ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। একসময় কোনো জটিল বা চাঞ্চল্যকর অপরাধের ক্লু বের করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা অভিজ্ঞ ক্রাইম রিপোর্টারদের গভীর অনুসন্ধানের ওপর নির্ভর করতেন। সাংবাদিকরা মাঠে নেমে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য ও প্রমাণ বের করে আনতেন, যা মূল তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিত। সে যুগে সাংবাদিকদের সম্মান, মর্যাদা ও পেশাগত স্বাধীনতা ছিল ঈর্ষণীয়। অথচ আজ চিত্রটি একদম উল্টো। আমরা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ছেড়ে পুরোপুরি প্রেস রিলিজ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখস্থ বক্তব্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছি। তাদের সাজানো বক্তব্য আর রঙিন প্রেস ব্রিফিংই এখন আমাদের প্রধান সংবাদ। একটু কষ্ট করে নিজে অনুসন্ধান করা কিংবা তথ্যের আড়ালে থাকা সত্য জানার চেষ্টাটুকুও আমরা করি না। কেবল রেডিমেড তথ্যের ওপর নির্ভর করে সংবাদ শেষ করার ফলে সাংবাদিকতার মৌলিক স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা আজ বিলুপ্তির পথে। বৃহত্তর সিলেট বিভাগেই আজ অফলাইন ও অনলাইন মিলিয়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক গণমাধ্যম এবং ডজনখানেক সাংবাদিক সংগঠন রয়েছে। সাংবাদিকের সংখ্যাও এখন হাজার ছাড়িয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগের বিষয়—প্রায় সব পত্রিকাতেই একই সংবাদ এবং একই শিরোনাম এখন অতি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের গণমাধ্যমে সবচেয়ে বড় সংকট হলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের মূল্যায়ন না হওয়া। অনেক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান মাসের পর মাস সাংবাদিকদের ঘাম ঝরানো বেতন-সম্মানি দেয় না, অথচ সংবাদের প্রভাবকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মালিকরা ঠিকই রাতারাতি শিল্পপতি বনে যাচ্ছেন। কোনো প্রতিবেদক যখন বহু কষ্টে দুর্নীতির খবর উন্মোচন করেন, অনেক ক্ষেত্রে সেই সংবাদটিই অপরাধীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার নজির রয়েছে। আর যারা নীতি-নৈতিকতা বজায় রেখে সততার সাথে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে চান, পত্রিকা কর্তৃপক্ষ তাদের চাকরি বেশিদিন রাখতে চায় না। ফলে বহু অভিজ্ঞ ও দক্ষ অনুসন্ধানী সাংবাদিক বাধ্য হয়ে পেশা ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন অথবা ভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। সংবাদ সম্মেলন বা কোনো বড় অনুষ্ঠানে এখন সাংবাদিকদের ভিড়ে দাঁড়ানোই দায়, অথচ সেই ভিড়ের মাঝে আসল অনুসন্ধান বা নিরপেক্ষ সত্য সন্ধান একেবারেই অনুপস্থিত। সত্যতা যাচাই না করে একটিমাত্র ভিত্তিহীন অভিযোগ পেলেই সেটিকে অস্ত্র বানিয়ে চরিত্রহননের সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণের নামেও চলছে নানা অসংগতি; কোটি কোটি টাকা খরচের পর দিনশেষে সাংবাদিকদের হাতে কেবল এক টুকরো কাগজের সার্টিফিকেটই জোটে, কিন্তু কাজের গভীরতা বা নৈতিকতার চর্চা হয় না। নতুন কেউ এই পেশায় শিখতে এলে তাদের উৎসাহিত করার বদলে ‘ভূঁইফোড়’ বা ‘ভুয়া’ তকমা দিয়ে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা হচ্ছে। উপরন্তু, সারাদেশে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকরা যখন পদে পদে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন, তখন সাংবাদিক সংগঠনগুলো কার্যকর ভূমিকা না রেখে নিশ্চুপ থাকছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা যেকোনো কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে তথ্য উপস্থাপন করবে—সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাংবাদিকের মূল কাজ হলো সেই বলয়ের বাইরে গিয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা। এই অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পুলিশের ব্রিফিং বা প্রেস রিলিজ সংবাদের শেষ কথা নয়, বরং এটি অনুসন্ধানের প্রাথমিক সূচনাবিন্দু মাত্র। কর্তৃপক্ষ কী দাবি করল তার চেয়ে বড় কথা ঘটনাটি প্রকৃতপক্ষে কীভাবে ঘটেছে, তা নিরপেক্ষভাবে নিজের তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণ সংগ্রহের মাধ্যমে তুলে ধরা। কে কত দ্রুত অন্যের লেখা চুরি করল সেই দৌড় বন্ধ করে কার অনুসন্ধান কতটা নিখুঁত, তথ্যভিত্তিক ও প্রভাব বিস্তারকারী—সেই সুস্থ প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। প্রবীণ সাংবাদিকদের মূল দায়িত্ব হলো প্রজ্ঞার আলো ছড়িয়ে নতুনদের সঠিক পথ দেখানো ও কাজ শেখানো। একই সাথে, সাংবাদিকদের ওপর যেকোনো হামলা, নির্যাতন বা পেশাগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে সকল বিভেদ ভুলে এক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এখন সময়ের দাবি। কর্মীদের রক্ত-ঘাম বেচে ব্যক্তিগত আখের গোছানোর দিন শেষ হওয়া দরকার। প্রতিটি লেখা প্রকাশের আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—এই সংবাদটি সমাজে আলো ছড়াচ্ছে, নাকি বিভ্রান্তি তৈরি করছে? অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কোনো অলস সময়ের পেশা নয়, এটি একটি মহান সামাজিক দায়বদ্ধতা। কপি-পেস্ট ও অলসতার সাংবাদিকতা ত্যাগ করে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে লালন করাই এখন আমাদের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
Leave a Reply