
আব্দুল মুনিব কানাডা থেকে :
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে যে দলটি রাষ্ট্রের সমস্ত নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদের স্টিমরোলার মোকাবিলা করে টিকে থাকল, সেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্দরমহলে এখন এক নীরব কিন্তু গভীর রক্তক্ষরণ চলছে। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যেখানে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঝে স্বস্তি ও মূল্যায়নের সুবাতাস বওয়ার কথা ছিল, সেখানে ভর করেছে এক চরম হতাশা ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব। যে কর্মীরা মামলার হুলিয়া, সম্পত্তি ক্রোক, গুম আর খুনের নির্মম নিয়তিকে আলিঙ্গন করেও রাজপথ ছাড়েননি, আজ পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারাই যেন নিজেদের নিজ ঘরে ‘পরবাসী’ ভাবছেন।প্রশ্ন উঠেছে, ১৭ বছরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ফসল কি তবে এক শ্রেণীর সুযোগসন্ধানী এবং ক্ষমতার উপজাতদের (Byproducts) পকেটে চলে যাচ্ছে? তৃণমূলের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কেবল দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাই নয়, বরং বিএনপির দীর্ঘদিনের অর্জিত রাজনৈতিক পুঁজিকেও এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
রাজপথের সৈন্য বনাম ড্রয়িংরুমের সুবিধাভোগী: বিএনপির শক্তির মূল উৎস কখনোই তার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ড্রয়িংরুমের চতুর কূটনীতিকরা ছিলেন না; বরং ছিলেন গ্রাম-গঞ্জ, ইউনিয়ন আর ওয়ার্ড পর্যায়ের সেই নিঃস্বার্থ কর্মীরা, যারা দিনের পর দিন পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে ফেরারি জীবন কাটিয়েছেন। বহু পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম অভিভাবককে হারিয়েছে, বহু মায়ের কোল খালি হয়েছে। এই ত্যাগ কোনো ব্যক্তিস্বার্থের জন্য ছিল না, ছিল দলের আদর্শ ও ফ্যাসিবাদের পতনের লক্ষ্যে। তবে ক্ষমতার হাওয়া বদল হতেই দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। মাঠপর্যায়ের অভিযোগ—বিগত আন্দোলনের কঠিন দিনগুলোতে যারা নিষ্ক্রিয়তার নিরাপদ চাদর গায়ে জড়িয়ে রেখেছিলেন কিংবা সুকৌশলে শাসকগোষ্ঠীর সাথে লিয়াজোঁ রক্ষা করেছিলেন, আজ তারাই বসন্তের কোকিলের মতো রাজনীতির অগ্রভাগে আবির্ভূত হয়েছেন। ত্যাগী কর্মীরা যখন এখনো মামলার ক্ষত আর আর্থিক অনটনের সাথে লড়াই করছেন, তখন আন্দোলনের মাঠে অনুপস্থিত একদল সুবিধাবাদী ক্ষমতার অলিন্দে নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করছে।
সাংগঠনিক বিচ্যুতি: পকেট কমিটি ও মাই ম্যান সংস্কৃতির বিস্তার: সাম্প্রতিক সময়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে যে অসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটছে, তা দলের ভেতরকার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। তৃণমূলের ক্ষোভের মূল ক্ষেত্রগুলো হলো: অনুগততন্ত্রের আধিপত্য: মেধা, সততা ও ত্যাগের চেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য বা ‘মাই ম্যান’ সংস্কৃতি কমিটি গঠনের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছে।
বাণিজ্যিকীকরণ: কোথাও কোথাও পদ-পদবি বণ্টনে আর্থিক লেনদেনের যে গুঞ্জন উঠছে, তা দলটির ঐতিহ্য ও আদর্শিক ভিতকে দুর্বল করছে। নেতৃত্বের অবমূল্যায়ন: রাজপথের পরীক্ষিত ও জেনুইন নেতাকর্মীদের কৌশলে কোণঠাসা করে লবিং-সর্বস্ব ব্যক্তিদের নেতৃত্বে বসানো হচ্ছে, যা মাঠপর্যায়ে চরম এক ধরনের ‘আস্থার সংকট’ (Crisis of Confidence) তৈরি করেছে।
পরিচয় সংকট এবং ছদ্মবেশী ফ্যাসিবাদের ছায়া: তৃণমূলের সবচেয়ে বড় অ্যালার্মিং অভিযোগটি হলো—বিএনপির সাইনবোর্ড ব্যবহার করে এক শ্রেণীর নব্য ও সুবিধাবাদী নেতার আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং উগ্র দখলদারিত্ব। ১৭ বছর ধরে যে দলটির কর্মীরা নির্যাতিত হয়েছেন, আজ কিছু নামধারী নেতার অপকর্মের কারণে সাধারণ মানুষের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে পুরো দলটিকে। “ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অর্থ কেবল ক্ষমতার হাতবদল ছিল না, ছিল ব্যবস্থার পরিবর্তন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যখন দেখা যায় দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ পূর্ববর্তী শাসকের মতোই আচরণ করছে, তখন ত্যাগী কর্মীদের নৈতিক পরাজয় ঘটে।”
—রাজনৈতিক পর্যালোচক। এর চেয়েও বড় বিড়ম্বনা হলো, বহু এলাকায় আওয়ামী লীগের সাবেক ক্যাডার ও সুবিধাভোগীরা সম্পূর্ণ বহাল তবিয়তে রয়েছে। বিএনপির ভেতরেরই কিছু প্রভাবশালী অংশের সাথে ‘কৌশলগত সমঝোতা’ বা আঁতাতের মাধ্যমে তারা যেমন পার পেয়ে যাচ্ছে, তেমনি বহাল রাখছে তাদের ভয়ের রাজত্ব। ফলে যে সাধারণ মানুষ ফ্যাসিবাদের অবসান চেয়েছিল, তারা এখন এক ধরনের প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
কৌশলগত ঝুঁকি: নেতৃত্বের জন্য যে বার্তা: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ট্রানজিশন পিরিয়ড বা রূপান্তরকালীন সময় পার করছে। এই সময়ে তৃণমূলের ক্ষোভকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইতিহাস সাক্ষী, যে দল তার মূল চালিকাশক্তি তথা তৃণমূলকে অসন্তুষ্ট রেখে কেবল উপরিকাঠামোর ওপর ভর করে এগোতে চায়, তারা শেষ পর্যন্ত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলনের ফসল ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে হলে বিএনপিকে অবিলম্বে কয়েকটি কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে: কঠোর শুদ্ধি অভিযান: দলের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী, চাঁদাবাজ এবং সমঝোতাকারীদের বিরুদ্ধে মুখে ‘জিরো টলারেন্স’ বলার পাশাপাশি বাস্তবে দৃষ্টান্তমূলক বহিষ্কার ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃণমূলের ক্ষমতায়ন: কমিটি গঠনে লবিং কালচার ভেঙে সরাসরি মাঠের কর্মীদের মতামত ও ত্যাগের খতিয়ানকে একমাত্র যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আস্থার পুনর্নির্মাণ: নির্যাতিত ও শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করে নেতৃত্বের প্রতি তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। বিএনপির হাইকমান্ডকে বুঝতে হবে, তৃণমূলের এই ক্ষোভ কোনো বিদ্রোহ নয়, বরং এটি এক ধরনের গভীর অভিমান ও দলের অস্তিত্ব রক্ষার আকুতি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যারা বুক পেতে দিয়েছিলেন, তারা আজ কোনো বিশেষ অনুগ্রহ চান না, চান কেবল ত্যাগের ন্যূনতম স্বীকৃতি ও আত্মমর্যাদা। দল যদি সময়মতো এই ক্ষত নিরাময় করতে না পারে এবং ছদ্মবেশীদের লাগাম টেনে না ধরে, তবে দীর্ঘ ১৭ বছরের ত্যাগের মহিমান্বিত ইতিহাস সুবিধার রাজনীতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে—যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
Leave a Reply